kalerkantho


অন্যের কাছে হাত পাতা ছেড়ে সন্মানের সঙ্গে করছেন ব্যবসা

ভিক্ষুক আব্দুল গণির দিন বদলের গল্প

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভিক্ষুক আব্দুল

গণির দিন

বদলের গল্প

কয়েক মাস আগেও বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করতেন প্রতিবন্ধী আব্দুল গনি (৬০)। টাকার জন্য তাঁকে সবার কাছে হাত পাততে হত। কেউ দিতেন আবার কেউবা অবহেলায় মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে মান সন্মান ক্ষুণ্ন করে দিনশেষে যা পেতেন তাতেই কোনোরকমে চলত পরিবার। কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। হঠাৎ-ই বদলে গেছে সব। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে আব্দুল গণি এখন একজন ব্যবসায়ী। সরকারি আর্থিক সহযোগিতায় সম্মানের সাথে ব্যবসা করে যা আয় হচ্ছে তাতেই ভীষণ খুশি তিনি ও তাঁর স্ত্রী।

ভিক্ষুক আব্দুল গণির বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের দক্ষিণ ফেদাইনগর গ্রামে। তিনি ওই এলাকার মৃত বাদশা মিয়ার পুত্র। আব্দুল গণির মুদি দোকানটি নিজ বাড়ির সামনেই। গতকাল সোমবার দুপুরে সেখানে বসেই কথা হয় তাঁর সাথে। আলাপকালে তিনি হাসিমুখেই তাঁর জীবনের উত্থান পতনের গল্প বলেন। তিনি জানান, তাঁর জীবনের শুরুটা এত কঠিন ছিলো না। কর্মজীবনের শুরুতে উপজেলার বাঁশবাড়িয়ার এম এম জুট মিলসে লাইনসর্দার হিসেব চাকরি করতেন। সেখানে সিবিও নেতাও ছিলেন। ২০০৬ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গরুর ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু জীবনের সবকিছু বদলে দেয় একটি দুর্ঘটনা। ২০১৩ সালে এক ট্রাক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এর পর থেকে তাঁর চিকিৎসায় স্ত্রীর গহনাসহ সহায় সম্পদ বিক্রি করতে করতে প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো খরচ করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান তিনি। এসময় বাম পা পঙ্গু হয়ে যায়। সংসারে স্ত্রী ছাড়াও ৭ ছেলে মেয়ে তাঁর। সংসারে অভাব তীব্র হয়ে উঠলে একে একে সব ছেলেমেয়েরা তাঁকে ছেড়ে চলে যায় অন্যত্র। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী ছমেনা খাতুন, ছোট ছেলে, এক নাতনি থেকে যায় তাঁর সাথে। আর্থিক দৈন্যতা প্রবল হয়ে ওঠলে এদের মুখে খাবার তুলে দিতে ভিক্ষাবৃত্তিতেই নামতে হয় তাঁকে। আব্দুল গনি জানান, গ্রামে গ্রামে ঘুরে এবং যাকে সামনে পেতেন তার কাছেই টাকার জন্য হাত পাততেন তিনি। এমনিভাবে একদিন ভিক্ষার জন্য হাত পাতেন পথচারী উপজেলার পরিসংখ্যান ব্যাংকের (একটি বাড়ি একটি খামার কার্যক্রম) ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ছোটন চন্দ্র নাথের কাছে। এসময় ছোটন তাঁর ভিক্ষাবৃত্তির কারণ জানতে চান। কথায় কথায় জানতে পারেন সব। সব শুনে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আব্দুল গণির কথা জানান তিনি। ঠিক এমনি সময়ে গত বছরের শেষ দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে ভিক্ষুকদের প্রতিষ্ঠিত করার কথা জানালে ছোটন নিজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁকে আব্দুল গণির কথা জানান। পরে তাঁকে আনা হয় নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে। এখানে ইউএনও সব শুনে উপজেলার আরো ২২ জন ভিক্ষুকের সাথে আব্দুল গণিকেও প্রতিষ্ঠিত করতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক আব্দুল গণি আরো বলেন, আমাকে বাড়ির সামনে সরকারি আর্থিক সহায়তায় একটি মুদি দোকান করে দেবার পর সেই দোকানে নানারকমের মুদি দ্রব্য রেখে বিক্রি করতে থাকি। গত কয়েক মাসে গ্রামের ভেতরের এই দোকানটি বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেছে। সববয়সী মানুষ এখানে আসেন কেনাকাটা করতে। এখন তিনি দৈনিক গড়ে ৫-৬’শ টাকা আয় করেন। এতে তার সংসার চলছে অনায়াসে। এজন্য লাখ লাখ শুকরিয়া। তবে একটি মেয়ে এখনো অবিবাহিত রয়েছে। তাই একটু চিন্তায় আছেন। তাঁর বিয়ে হয়ে গেলে একেবারে নিশ্চিন্তে মরতে পারতেন বলে জানিয়ে আজকের এ দিন বদলের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান ইউএনও ও পরিসংখ্যান ব্যাংকের ছোটনের কাছেও। তাঁর এ ব্যবসায় সার্বিক সহযোগিতা করেন স্ত্রী ছমেনা খাতুন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর স্বামীর চিকিৎসায় নিঃস্ব হয়ে যাই আমরা। এখন আবার নিজের চোখের সামনে দোকান করতে পারছে। যা আয় হচ্ছে তাতে ভালোভাবেই চলছি আমরা। তিনিও সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানান। উপজেলা পরিসংখ্যান ব্যাংকের এফ.এ ছোটন চন্দ্র নাথ বলেন, আব্দুল গনি একদিন আমার কাছে ভিক্ষা চাওয়ায় তাঁর সাথে পরিচিত হই। সব শুনে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচিতে তাঁর নাম দিই আমি। এখন ইউএনও স্যারের সহযোগিতায় তিনি মুদি দোকান পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এতেই আমি খুশি। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আব্দুল গণিসহ মোট ২২জন ভিক্ষুককে সরকারি আর্থিক সহায়তা দিয়েছি আমরা। গনি আন্তরিকতার সাথে মুদি দোকান পরিচালনা করে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এভাবে চালিয়ে গেলে একদিন তিনি আরো অনেক উন্নতি করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।


মন্তব্য