kalerkantho


নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাগরে চিংড়ির পোনা শিকার

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সাগর উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বাগদা চিংড়ি অবৈধভাবে আহরণ ও পাচার করছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গত কয়েক মাস ধরে ওই চক্রের সদস্যরা প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকার চিংড়ি পাচার করেছে। এ সময়ে উপজেলা মৎস্য বিভাগের প্রচেষ্টায় পাচারকালে বেশ কয়েকটি চিংড়ির চালান আটকও হলে এসব তথ্য বের হয়ে আসে। তাঁরা অন্তত কোটি টাকার চিংড়ি পোনা আটক করেছেন বলে জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তা। কিন্তু তাঁদের অভিযানের মধ্যেও পাচারকারীরা সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অবৈধ চিংড়ি আহরণ ও পাচারের বিরুদ্ধে উপজেলা মৎস্য বিভাগের টানা অভিযানের পর কিছুদিন পোনা শিকারীরা মাছ শিকার বন্ধ রাখেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আবারও চিংড়ি শিকার ও পাচার শুরু হয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার মুরাদপুর ও কুমিরা সাগর উপকূলে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করলে দুই জায়গাতেই চিংড়ি শিকার করতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহেদ হোসেন নিজামী বাবু বলেন, ‘আমার এলাকাতেও বেশ কয়েকজন চিংড়ি পাচারকারী আছে। তারাই জেলে ও মৎস্য শিকারীদের দাদন দিয়ে চিংড়ি শিকার করিয়ে পরে নিজে সেসব মাছ পাচার করে। কিন্তু মৎস্য কর্মকর্তা আমাকে এ বিষয়ে বলার পর আমি এসব দাদনদারদের চিংড়ি শিকার বন্ধ করতে বলেছি।

এখন তো আর চিংড়ি শিকারের কথা না। ’

এরপরও যদি কেউ শিকার করে তবে তা লুকিয়ে চুকিয়ে। তবে তা আগের মতো ব্যাপকভাবে নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে সূত্র জানায়, এখানে দীর্ঘকাল ধরে চিংড়ি শিকার ও পাচার চলছে। পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাগদা চিংড়ি সংগ্রহ করে তা খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে তারা একেবারে বিনা বাধায় চিংড়ি আহরণ ও পাচার করেছে।

বর্তমান মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা এসব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। ফলে অবৈধ চিংড়ি শিকারি ও মৎস্য কর্মকর্তার মধ্যে একপ্রকার চোর পুলিশ খেলা চলছে। মৎস্য কর্মকর্তা সাগর পাড়ে গেলেই শিকারির দল উধাও আবার তিনি ফিরে আসার পরেই তারা চিংড়ি শিকার করে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করছে। গত কয়েক মাসে এভাবে চিংড়ি পাচারকালে বহুবার চালান আটক করেছেন মৎস্য কর্মকর্তা। এসব অভিযানে তাঁর পাশে ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া ও বিদায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রুহুল আমিন।

মৎস্য কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা অবৈধভাবে মাছ শিকারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে ইউএনও ও এসি ল্যান্ডকে তা জানাতেন। আর এ তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে তারাও সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে বেশ কয়েকটি চক্র অবৈধভাবে চিংড়ি শিকার ও পাচারে জড়িত। তারা স্থানীয় জেলেদের অর্থের লোভ দেখিয়ে অবৈধভাবে চিংড়ি আহরণে উৎসাহিত করেন। এতে জেলেরা নিষিদ্ধ জাল দিয়ে চিংড়ি শিকার করতে গিয়ে বহু প্রজাতির মাছ ধ্বংস করেছে। তিনি বলেন, পাচারকারীরা অত্যন্ত গোপনে পোনাগুলো পাচার করলেও আমাদের সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে বহু পোনা আটক করেছি। গত কয়েক মাসে অন্তত ৫৪ লাখ চিংড়ি পোনা আমরা আটক করেছে। যার মূল্য কোটি টাকারও বেশি। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অভিযানকালে একেকবার ২০ লাখ পোনাও আটক করেছি। এছাড়া দু-তিন লাখ বা এর কমবেশি বহু চালান আটক হয়েছে। চিংড়ি পাচার রোধে আমরা নিয়মিতই অভিযান চালাচ্ছি। এটি রোধ করা গেলে শুধু চিংড়িই রক্ষা পাবে না আরো বহু প্রজাতির মাছ রক্ষা পাবে। ’

এদিকে গত কয়েক মাসে টানা অভিযান চললেও গত এক মাসে চিংড়ির একটি চালানও আটক হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে জানান, চিংড়ি শিকার চলছেই। স্থানীয় জেলে ও কিছু মাছ শিকারী বিহিন্দি জাল দিয়ে চিংড়ি আটক করে তা পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করলে তারা সেগুলো খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাছাড়া গত এক মাসে কোনো অভিযান না হওয়ায় অনেকটা নিরাপদেই চিংড়ি পাচারের ব্যবসা করেছে কয়েকটি সিন্ডিকেট।

এ বিষয়ে মৎস্য কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘আমার একটি অপারেশন হওয়ায় গত ২০ দিনের মতো এখানে ছিলাম না। এ সময়ে কি হয়েছে আমি জানি না। তবে এ মৌসুমে চিংড়ি আহরণ কিছুটা কম হওয়ার কথা। এখন আমি এসেছি, আবারও অভিযান শুরু হবে। ’

কেউ চিংড়ি আহরণ কিংবা পাচারের তথ্য পেলে তাঁকে জানানোর অনুরোধ করেছেন তিনি।


মন্তব্য