kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় অঙ্গনের সংগ্রাম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জগতে একটি উজ্জ্বল নাম ‘অঙ্গন’। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান এই সংগঠনের। এখানে রয়েছে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করা শিক্ষকদের পদচারণা। সংস্কৃতিপ্রেমীদের এ সংগঠন নিয়ে লিখেছেন : মোবারক আজাদ

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় অঙ্গনের সংগ্রাম

‘সুস্থ সংস্কৃতি হোক মানবিক সমাজ গঠনের হাতিয়ার’ এই প্রতিপাদ্য ধারণ করে  ১৯৯০ সালের  ১৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন অঙ্গন। নাচ, গান, কবিতা ও অভিনয় এই চারটি শাখা নিয়ে অঙ্গন নিয়মিত কাজ করে চলেছে।

বর্তমানে এই সংগঠনে শতাধিক শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে জড়িত আছে। এ বছর সংগঠনটি ২৮ বছরে পদার্পণ করছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজ বদলের যে দর্শন সেক্ষেত্রে ২৮ বছর ধরে অঙ্গন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দুই যুগেরও বেশি সময় এই পথচলায় এখান থেকে ওঠে এসেছেন শত শত সংস্কৃতিকর্মী। তাঁদের কেউ শখের বসে এসেছে এই সংগঠনে আবারও কেউ এসেছেন স্বপ্নপূরণ করতে নিজের পাকাপোক্ত একটা অবস্থান করে নিতে।

যে শিক্ষার্থী মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কথা বলার সাহস করতে চাইতেন না! এই সংগঠনে এসে সেই শিক্ষার্থী একটা সময় হাজারো দর্শককে নাচ, গান ও কবিতা আবৃত্তি দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তাই বলা যায়, অঙ্গন একটি নিরন্তর অধ্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক চিত্রের প্রতীক।

এখানে নৈতিক মানস গঠন এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে অঙ্গন সবসময় আমন্ত্রণ পেয়ে থাকে।

এজন্য প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়া নতুন মুখ নিয়ে অঙ্গন পরিবার তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বেগবান করে চলছে।

অঙ্গন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক একটি অরাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠন হলেও এর পরিচিতি ও প্রসার আজ বিশ্বব্যাপী।

অঙ্গনের সদস্যরা সবসময় বাংলা সংস্কৃতির প্রবাহকে তুলে ধরছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সম্মানিত ও পণ্ডিত শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ভাষাতত্ত্ববিদ ও কবি অঙ্গনকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য-সহযোগিতা করছেন।

একটি সংগঠনের এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক উৎসাহ, কঠোর পরিশ্রম, শ্রদ্ধা, সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ব ইত্যাদি প্রয়োজন। অঙ্গন এমন প্রতিষ্ঠান যা সেই গুণাবলির সমষ্টি।

দিন দিন তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ পাশ্চাত্য সংস্কৃতি দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছে। এই প্রতিকূল এবং কঠোর সময় অঙ্গন তার নিজস্ব পদ্ধতিতে দৃঢ় হয়েছে কারণ এটি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তার দায়িত্বে বাঁধা।

অঙ্গন শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে। চট্টগ্রাম শহরে 'অঙ্গন নগর শাখা এবং ঢাকায় ‘অঙ্গন ফাউন্ডেশন ও আমেরিকা, লন্ডন, কানাডায় এর শাখা  রয়েছে। অঙ্গনের সদস্যরা পড়াশোনা সমপন্ন করে সবাই নিজ নিজ অবস্থানে সফল। বর্তমানে অঙ্গনের অনেক সদস্য বিদেশে বসবাস করছেন। আশা করা যাচ্ছে অচিরেই অঙ্গন দেশের সংস্কৃতিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে।

একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অঙ্গন তার খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। অঙ্গন বাঙালির নিজস্ব সভ্য সংস্কৃতি, আধুনিক চিন্তাভাবনা, খোলা কথোপকথন সগৌরবে প্রচার এবং অবিচারের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান। অঙ্গনের এই অবস্থান এক দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২৮ বছরে নানা প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে এটি তার বর্তমান অবস্থানে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অঙ্গনের সভাপতি প্রফেসর ড. রাহমান নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠশালার মতো পঠন-পাঠন হবে তা নয়। কারিকুলাম কার্যক্রম থাকবে, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দর্শন সেখানে তার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মানুষের মনন ও চিন্তার জায়গা নির্মাণ করবে। অঙ্গন এই কার্যক্রমে সব সময় ভূমিকা রাখছে। এই ধারাবাহিকতায় অঙ্গন আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং তার সদস্যরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলছে। ’

প্রফেসর ড. রাহমান আরো বলেন, ‘মিডিয়ার ব্যাপক প্রসারের মধ্য দিয়ে পাশ্চত্য সংস্কৃতির যে ভাবে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন করছে তা রোখার জন্য অঙ্গন কাজ করছে। তবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভালো কিছু গ্রহণ করব, কিন্তু যেগুলো আমাদের সংস্কৃতিতে আঘাত করবে সেগুলো বর্জন করব। এই গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে বাঙালির সংস্কৃতির যে সুস্থ ধারা অঙ্গন সেটা বজায় রাখবে। সর্বদা অঙ্গনের কর্মীরা একেকজন বাঙালি সুস্থ সংস্কৃতির অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করবে। ’


মন্তব্য