kalerkantho


বিলবোর্ডে ঢাকা গ্রামীণ সৌন্দর্য

রঙিন বিলবোর্ডে আড়াল হয়ে যাচ্ছে সবুজ গ্রাম। বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড কেড়ে নিচ্ছে গ্রামীণ সৌন্দর্য। চট্টগ্রাম নগরে উচ্ছেদ হওয়ার পর গ্রামে হানা দিয়েছে বিলবোর্ড কম্পানি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুপাশে যত্রতত্র স্থাপন করা হচ্ছে বিলবোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতেও বিলবোর্ড। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে পান না চালক। ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : জাহাঙ্গীর আলম সাতকানিয়া

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিলবোর্ডে ঢাকা গ্রামীণ সৌন্দর্য

বিলজুড়ে পাকা আমন ধানের সোনালি আভা। হেমন্তের নীল আকাশ।

ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে একদল সাদা বক। বিলের মাঝে দল বেঁধে ধান কাটছেন কৃষক। কেউ কেউ কাটা ধান আঁটি বেঁধে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। বিলের বুক চিরে চলে গেছে গ্রামীণ মেঠোপথ। সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ নানা জাতের গাছ। রাখাল ছুটে চলছে গরুর পাল নিয়ে। আহা! কী অপরূপ গ্রামীণ সৌন্দর্য। প্রতিটি দৃশ্যই গেঁথে যায় হৃদয়ে। কিন্তু না, সেই দৃশ্যে বাসা বাঁধছে যন্ত্রণা। ধানের ক্ষেতে বড় বড় বিলবোর্ড।

গ্রামীণ দৃষ্টিনন্দন সব সৌন্দর্যকে আড়াল করে দিয়েছে বিলবোর্ড। বিলবোর্ড শহর ছেড়ে এখন গ্রাম দখল করে নিয়েছে। যাত্রীবাহী বাসের জানালার পাশে বসে যেতে যেতে মনোমুগ্ধকর সব দৃশ্য দেখে কিছুটা রোমাঞ্চিত হওয়ার পর গ্রামীণ সৌন্দর্যের বর্ণনা করতে করতে ধানক্ষেতের মাঝে বিশাল বিলবোর্ড দেখে মুহূর্তের মধ্যে আবার বিরক্ত প্রকাশ করলেন সাতকানিয়ার কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার মো. রফিকুল ইসলাম।

আসলেই বিলবোর্ডে ঢাকা পড়ছে গ্রামীণ সৌন্দর্য। রঙিন বিলবোর্ডর আড়ালে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সবুজ গ্রাম। বিভিন্ন কম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপন ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তোষামোদি বিলবোর্ডের কারণে দিনের পর দিন সৌন্দর্যহানি ঘটছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরে উচ্ছেদ করার পর গ্রামে হানা দিয়েছে বিলবোর্ড কম্পানি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুই পাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড স্থাপন করেছে। সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে বিলবোর্ডের কারণে অল্প দূরুত্বেও দেখা যায় না। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে পায় না চালকরা। এতে বিলবোর্ডের কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটছে। এসব বিলবোর্ডের কবলে পড়ে আপন সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে গ্রামীণ জনপদ। বিলবোর্ডের কারণে সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি বাড়ছে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিলবোর্ড ভেঙে পড়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে কথা বলে জানা গেছে এসব বিলবোর্ডের কোনোটির অনুমোদন নেই। কিন্তু অবৈধ এসব বিলবোর্ডের বিরুদ্ধে কখনো উচ্ছেদ অভিযান করতেও কাউকে দেখা যায়নি। ফলে সড়কের পাশে দিনের পর দিন বাড়ছে অবৈধ বিলবোর্ড।

সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী সেতু থেকে লোহাগাড়ার চুনতি পর্যন্ত এলাকায় সড়কের দুই পাশে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসানো হয়েছে ছোট-বড় আড়াই শতাধিক বিলবোর্ড। উঁচু ভবনের ছাদে, সড়কের দুই পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গায়, আবাদি জমিতে, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক এবং মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে অবৈধ এসব বিলবোর্ড। কোথাও কোথাও সড়কের পাশ ঘেঁষে সওজর জায়গায় শুধু একটি খুঁটির উপর মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৪০-৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে সড়কের মইজ্যারটেক, কলেজ বাজার, শিকলবাহা ক্রসিং, ভেল্লাপাড়া, শান্তিরহাট, মনসা চৌমহনী, বাদামতল, শাহগদী মার্কেট, আমজুরহাট, পটিয়া উপজেলা, মুন্সেফ বাজার, পোস্ট অফিস মোড়, পটিয়া থানার মোড়, ডাকবাংলো, পটিয়া বাসস্ট্যান্ড, কমল মুন্সিরহাট, চক্রশালা, মোজাফ্ফরাবাদ, চন্দনাইশের বিজিসি ট্রাস্ট, রৌশন হাট, বাদামতল, খান হাট, গাছবাড়িয়া কলেজ গেট, বাগিচাহাট, কসাইপাড়া, দেওয়ানহাট, দোহাজারী, সাতকানিয়ার বিওসির মোড়, মৌলভীর দোকান, পাঠানীপুল, খুনি বটতল, কেরানীহাট, সাতকানিয়া রাস্তার মাথা, হাসমতের দোকান, টাইম ক্যাফে, মিঠার দোকান, শিশুতল, ঠাকুরদিঘি, লোহাগাড়ার পদুয়া তেওয়ারী হাট, বার আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ, রাজঘাটা, বটতলী স্টেশন, মোস্তাফিজুর রহমান কলেজ, আধুনগর ও চুনতিসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে এসব বিলবোর্ড। অবৈধ এসব বিলবোর্ডের ফলে একদিকে সৌন্দর্যহানি ঘটছে। অন্যদিকে সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন কম্পানি পণ্যের বিজ্ঞাপনী কাজে এসব বিলবোর্ড ব্যবহার হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কোনো নেতার আগমন, জম্ম-মৃত্যুবার্ষিকী, ঈদের শুভেচ্ছাসহ নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিলবোর্ড স্থাপন করছে। এসব বিলবোর্ড ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে গ্রামীণ হাট-বাজার। কোনো কোনো স্থানে গত ঈদ-উল ফিতর ও ঈদ উল আযহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বসানো বিলবোর্ড এখনো রয়ে গেছে। বিগত প্রায় দেড় মাস আগে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কক্সবাজার আগমন উপলক্ষে সড়কের দুই পাশে স্থাপিত বিলবোর্ডগুলো এখনো রয়ে গেছে। বিভিন্ন কম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপন ও রাজনৈতিক নেতাদের এসব বিলবোর্ডের ফলে পর্যটননগরী কক্সবাজার ও পাহাড়ি কন্যা বান্দরবানে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি দিনদিন শ্রীহীন হয়ে পড়ছে।

সাতকানিয়ার কেরানীহাটের ব্যবসায়ী মোরশেদুল আলম জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুই পাশ বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে। এসব বিলবোর্ডের কারণে এলাকার সৌন্দর্য নষ্টের পাশাপাশি মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। উঁচু ভবনের ছাদে এবং সড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্থাপিত বিলবোর্ডগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দুমড়ে মুচড়ে পড়তে পারে। ভবনের উপর থেকে বিলবোর্ড ভেঙে পড়ে গত বছর কেরানীহাটে এক শিশু মারা গেছে। এছাড়া আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। তিনি আরো জানান, সড়কের কয়েকটি স্থানে শুধুমাত্র একটি খুঁটির পর বিশাল বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। ফলে জনস্বার্থে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড অপসারণ করা দরকার।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের বাসচালক লোহাগাড়ার মো. ইসহাক জানান, সড়কের দুই পাশে অসংখ্য বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতেও বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। এসব বিলবোর্ডের কারণে গাড়ি চালাতে নানাভাবে সমস্যা হয়। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোর মাঝামাঝি স্থানে এমনভাবে বিলবোর্ড বসানো হয়েছে যেখানে ৪০-৫০ ফুট দূরেও দেখা যায় না। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি কম দেখা যায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে চন্দনাইশের হাশিমপুর এলাকায় খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি বাঁকে এ ধরনের একটি বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। এছাড়াও কিছু কিছু বিলবোর্ডে আবেদনময়ী অনেক ছবি ব্যবহার করে পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। অনেক সময় চালকদের চোখ এসব ছবি এড়াতে পারে না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এজন্য এসব বিলবোর্ড দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ করা দরকার।

অনুমোদনহীন বিলবোর্ডের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজ্ঞাপন সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, কিছু কিছু কাজে বৈধ পথের চেয়ে অবৈধ পথ অনেক সহজ। সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদেরকে মৌখিকভাবে জানিয়ে টাকার বিনিময়ে বেশ কয়েকটি বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। তাতে কোনো সমস্যা হয়নি। অথচ এর আগে একটি বিলবোর্ড স্থাপনের জন্য অনুমোদন নিতে এক বছর ঘুরে পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী একটি বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন নিতে নিতে কয়েকটি বিলবোর্ডের মেয়াদ শেষ হবে। ফলে অনুমোদন ছাড়া স্থাপন করাটাই সহজ।

রাজনৈতিক নেতাদের বিলবোর্ডের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, সড়কের পাশে অনুমোদনহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বিলবোর্ড আওয়ামী লীগের নেই। যেগুলো আছে সেগুলো তাঁদের ব্যক্তিগত। হাইব্রিড নেতারা একটু বেশি তোষামোদি প্রকৃতির হয়। তাঁরা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবির চেয়েও নিজের ছবিকে বড় করে দিয়ে বিলবোর্ড স্থাপন করে বড় নেতা বনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে এ ধরনের বিলবোর্ড করার ব্যাপারে দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেই। এটা একান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে এসব বিলবোর্ড অনেক সময় সৌন্দর্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

দোহাজারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তোফায়েল মিয়া বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুই পাশে আমাদের জায়গায় কিছু বিলবোর্ড রয়েছে। তবে কোনো বিলবোর্ডের অনুমোদন নেই। সবগুলো অবৈধ। আবার সড়কের পাশের সব বিলবোর্ড সওজর জায়গায় নয়। কিছু কিছু সাধারণ লোকজনের জায়গায়ও করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতেও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। ’

তিনি আরো বলেন, ‘কিছু কিছু বিলবোর্ড আছে একটি খুঁটি সওজর জায়গায় আর অন্য খুঁটি পাবলিকের জায়গায়। অবৈধভাবে বিলবোর্ড স্থাপনের ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা এসব অবৈধ বিলবোর্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ’


মন্তব্য