kalerkantho


নলকূপে আর্সেনিকের থাবা

মিরসরাইয়ে চরম ঝুঁকিতে এক লাখ পরিবার ১৪ বছর ধরে আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ ও রোগী শনাক্তকরণ বন্ধ

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই   

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মিরসরাই উপজেলার এক লাখ পরিবার চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছে। এখানকার ভূগর্ভের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক থাকায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এমন ভয়াবহতা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের তথ্যমতে, ১৪ বছর আগে অর্থাৎ ২০০২-২০০৩ সাল নাগাদ এখানকার গ্রামে গ্রামে নলকূপগুলোর পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ করা হয়। একই সময় আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের কারণে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত ৪০ জনকে শনাক্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে উপজেলার ৫০ ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে।

জানা গেছে, ২০০৩ সালের পর থেকে এখানকার নলকূপগুলোর পানি পরীক্ষা এবং আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত রোগীর কোনো পরিসংখ্যান নেই উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে। শুধু তাই নয়, মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেননি।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, ২০০২-০৩ অর্থ বছরে উপজেলার ৭৫ হাজার ৩৬৬ পরিবারের ৩২ হাজার ৪৮০টি নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে। নিরীক্ষার আওতায় আসা নলকূপের পানিতে গড়ে ৩৯.৭৭ মাত্রায় আর্সেনিক থাকার বিষয়টি প্রমাণ মেলে।

এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৩৩টি নলকূপের প্রতিলিটার পানিতে .০৫ মিলিগ্রামের অধিক মাত্রায় আর্সেনিকের শনাক্ত করে নলকূপগুলোর পানি পান না করতে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।

২০০২-০৩ সালে চালানো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, মিরসরাই পৌরসভায় শতকরা ৬৬.৮৩ ভাগ, খইয়াছড়া ইউনিয়নে ৬৬.২৯ ভাগ, মায়ানী ইউনিয়নে ৫৬.১১ ভাগ, মিরসরাই সদর ইউনিয়নে ৬০.৯৬ ভাগ, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নে ৫১.৭৯ ভাগ, ওচমানপুর ইউনিয়নে ৫১.২০ ভাগ, ধুম ইউনিয়নে ৫১.০৯ ভাগ, কাটাছড়া ইউনিয়নে ৪৭.৬৬ ভাগ, হাইতকান্দি ইউনিয়নে ৪৫.৩৩ ভাগ, দুর্গাপুর ইউনিয়নে ৪৪৫.০৫ ভাগ, মঘাদিয়া ইউনিয়নে ৪০.৩৪ ভাগ, মিঠানালা ইউনিয়নে ৩৯.৮৫ ভাগ, ইছাখালী ইউনিয়নে ৩৯.১৭ ভাগ ও সাহেরখালী ইউনিয়নে ৩০.৩৬ ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত করা হয়।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কে এম সাঈদ মাহমুদের মতে, মিরসরাইয়ে আর্সেনিক থেকে মুক্তি পেতে এক লাখ পরিবারের প্রতি ১০ পরিবারের জন্য একটি করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা খুব জরুরি।

অথচ সেই হিসাবে উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে পুরো উপজেলায় মাত্র ৪৪১টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০০২-০৩ সালে সরকারিভাবে আর্সেনিকের ওপর জরিপ চালানোর আগে ২০০১ সালে মিরসরাইয়ে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ করতে জরিপ চালায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘প্রশিকা’। ওই সময় উপজেলার অধিকাংশ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হলে সুদমুক্ত ঋণে মিরসরাই সদর ও উপকূলীয় ইছাখালী ইউনিয়নে চার লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক দুটি বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট স্থাপন করে। ওই প্ল্যান্টগুলো থেকে প্রতি কলসি পানি ৩ টাকা দামে সরবরাহ করা হতো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরসরাই সদরের প্ল্যান্টটি দিয়ে ৭০-৮০ পরিবারের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটলেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। বর্তমানে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা সংকটে সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। ইছাখালী ইউনিয়নের প্ল্যান্টটির বিশুদ্ধ পানি ওই এলাকার জনগণ অর্থের বিনিময়ে কিনে পান না করায় প্ল্যান্ট মালিক লোকসান গুনে সেটি বন্ধ করে দেয়।

প্ল্যান্ট মালিক আবুল কালাম আজাদ জানান, এলাকার মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলেও অর্থ দিয়ে আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করতে চান না। ফলে প্রশিকার এক লাখ ১৯ হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ২০০৯ সালে প্ল্যান্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকার মিরসরাই অফিসের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ায় এ বিষয়ে সংস্থাটির কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার অধিকাংশ এলাকার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক বিষ থাকলেও এখন কোথাও কোনো নলকূপে আর্সেনিক শনাক্তকরণ লাল রঙের চিহ্ন নেই।

২০০১ সালে প্রশিকা নলকূপের পানি পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত নলকূপগুলোতে লাল চিহ্ন দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও সেই চিহ্ন এখন মুছে গেছে। ফলে উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এখন ওই নলকূপগুলোর আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।

এদিকে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে মানুষ কী ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে জানতে চাইলে মাতৃকা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক জামসেদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর্সেনিক বিষ মানব দেহে পচন রোগ, কিডনির সমস্যা, ক্যান্সার, হাত পায়ের তালুতে চর্মরোগের সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং এ রোগ থেকে মুক্তির জন্য উপজেলাজুড়ে পর্যাপ্ত গভীর নলকূপ স্থাপন খুবই জরুরি। ’

অবশ্য মিরসরাই উপজেলা এলাকায় আর্সেনিকের ভয়াবহতার কথা জানিয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কে এম সাঈদ মাহমুদ বলেন, ‘মিরসরাই উপজেলা আর্সেনিকের মারাত্মক ভয়াবহতার মধ্যে রয়েছে। উপজেলার প্রায় এক লাখের বেশি পরিবারের অধিকাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। এতে আর্সেনিকোসিস রোগের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ’

পরিত্রাণ পেতে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন জানতে চাইলে সাঈদ মাহমুদ বলেন, ‘আর্সেনিকোসিস থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার। কিন্তু এর কোনো ব্যবস্থা মিরসরাইতে নেই। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ায় এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় নলকূপের পানি পরীক্ষা ও রোগী শনাক্তকরণ কাজ বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ’


মন্তব্য