kalerkantho


শীতের কষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোহিঙ্গা শিশু

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শীতের কষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোহিঙ্গা শিশু

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বরইতলী ভাল্লুকিয়া জিরো লাইনে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা পরিবারের দেড় শতাধিক শিশু প্রচণ্ড শীতের কষ্টে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। পরনে শীতবস্ত্র নেই।

রাতে শীত নিবারণে নেই কম্বল। খালি গায়ে-খালি পায়ে পলিথিনের ঘরে ওদের দিন কাটে। দিনের শুরুতে রোদের ভাপে কিছুটা আরাম পেলেও পড়ন্ত বিকেলে পাহাড়ি উপত্যকার হু হু শৈত্যপ্রবাহ ওদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওপারে সেনা নির্যাতনে টিকতে না পেরে ২৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৪৯নং পিলারের কাছাকাছি এই এলাকায় এসে আশ্রয় নেয় ৭৮টি রোহিঙ্গা পরিবার।

সরকারি হিসাবে এই অস্থায়ী শিবিরের মোট জনসংখ্যা ৩৬২। ২৮ অক্টোবর দুই কন্যাশিশু ও এক ছেলেশিশু জন্ম নেয়। আর মারা গেছে এক ছেলেশিশু। এতে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৪ জনে। হিসাব অনুযায়ী এর মধ্যে পুরুষ ৯৩ জন, নারীর সংখ্যা ১০০।

কন্যাশিশু ৭৭ এবং ছেলেশিশু ৯৪।

শিবিরের বাসিন্দারা জানান, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, সমন্বয়ের অভাব এবং অনিবন্ধিত শিবির হবার কারণে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ছাড়া অন্য কারো সাহায্য পৌঁছে না এখানে। একসময় ইমামতি করতেন সামশুল আলম। এখন তিনি এই শিবিরের বাসিন্দা।

সামশুল আলম জানান, রেডক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে শিবিরের বাসিন্দাদের চাল, ডাল, ভোজ্য তেল দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলো খেতে যে তরিতরকারি লাগে, তার কথা তো কেউ ভাবে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে বার্মিজ টাকা আছে। কিন্তু এই টাকা বাংলাদেশে চলে না। তাই চাহিদা অনুযায়ী কিছুই কিনতে পারি না। ’

এমন পরিস্থিতিতে এক সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের দিন কাটানোর কথা বলেন তিনি।

রবিবার ওই শিবির পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অসংখ্য শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-ওখানে। উদোম গা-খালি পা। আগন্তক দেখলেই এসে জড়ো হচ্ছে কিছু পাবার আশায়।

তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল, ওপারেও ছিল না লেখাপড়ার কোনো অধিকার। এপারে এসেও শিক্ষার ছোঁয়া নেই ওদের জীবনে। সুযোগ নেই খেলাধুলা কিংবা লাফিয়ে-দাপিয়ে বেড়ানোর। খাড়া পাহাড়ের ঢালের নিচে পলিথিন-মাথার উপর পলিথিন, চারপাশে পলিথিনে ঘেরা ১২ বাই ১৭ ফুটের ঘরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা মাথায় নিয়ে কাটছে এই ১৭১ শিশু-কিশোরের দিন-রাত।

পানি ও স্যানিটেশনের প্রকট সংকট বরইতলী ক্যাম্পে। রেডক্রিসেন্টের বসানো একটি মাত্র নলকূপেও পানি ওঠে না। তাই পাহাড়ি ছড়ার মুখে মাটির বাঁধ দিয়ে তৈরি করা জলাধারই ওদের একমাত্র সম্বল। বৃষ্টি না থাকায় এটিও শুকিয়ে যাবে খুব সহসাই।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেই বুঝা গেল, আদর নেই, যত্ন-আত্তি নেই-এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠছে এখানে আশ্রয় নেয়া শিশু-কিশোররা।

দুবেলা ভাত খাবার সময়েই কেবল ঘরে ডাক পড়ে। বাকিটা সময় কাটে পরিচর্যাবিহীন। খাবার গ্রহণের আগে হাতধোয়া কিংবা মলত্যাগের পর সাবান দিয়ে জীবাণু তাড়ানোর ম্যাসেজ ওদের কাছে পৌঁছেনি।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে লেম্বুছড়ি-দোছড়ি হয়ে যেতে হয় বরইতলী। রাস্তাটি দুর্গম হওয়ার কারণে এখানে বেসরকারি সাহায্য পৌঁছে না বললেই চলে।

দোছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান  মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ তুলে ধরেন দুরবস্থার  প্রকৃত চিত্র।

তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদেশি নাগরিক, দাতা সংস্থা বা মিশনারিদের প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় দাতা সংস্থাগুলো বরইতলী শিবির পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং দুর্গম সড়ক ব্যবস্থা হওয়ায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপছন্দের তালিকায় এই ক্যাম্প। হাবিবুল্লাহ জানান, কয়েক মাস আগে এইচবিবি বিশিষ্ট নাইক্ষ্যংছড়ি-দোছড়ি সড়কের ইট তুলে খোয়া/কংকর দিয়ে সাব-বেজ নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় এই সড়কে ছোট ছোট গাড়ি এবং মোটরসাইকেল চালানোও কষ্টকর। সম্প্রতি ঠিকাদার চম্পট দেওয়ায় সে কাজও বন্ধ। কবে শেষ হবে কেউ জানে না। এই অবস্থায় স্থানীয় মানুষরাও বরইতলী শিবিরে গিয়ে সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য দেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন।

একটি স্মরণীয় দিন : বরইতলী ভাল্লুকিয়া শিবিরবাসীর জীবনে ২৮ অক্টোবর একটি স্মরণীয় দিন। এদিনে ওই শিবিরে চারটি জন্ম-মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিনটি শিশুর আগমন ঘটেছে পৃথিবীতে। বিদায় নিয়েছে একজন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব পরিবারে এসব ঘটনা ঘটেছে তাঁদের সবাই নিজ দেশের ভিটেমাটি ছেড়ে এই শিবিরে এসেছেন ঠিক দুমাস আগে ২৮ আগস্ট।

শিবিরে রোহিঙ্গাদের অঘোষিত মুখপাত্র সামশুল আলম জানান, ইসলামের নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নবজাতক এই তিনটি শিশুর নাম রাখা হয়েছে জান্নাত উল্লাহ, রাবেয়া বসরী ও তৈয়বা বেগম। আর এক বছরের যে শিশুটি মারা গেছে তার নাম ছিল আনসারুল্লাহ।

সূত্র জানায়, মফিজুর রহমান ও সাবেরা খাতুন দম্পতির সন্তান জন্ম নেওয়ার সাথে সাথেই বরইতলী শিবিরে বেহেশতের শান্তি কামনা করে সবাই মিলে ওর নাম রাখেন জান্নাত উল্লাহ।

হাবিবুর রহমান এবং জিনাত আরা দম্পতির কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় ইসলামের মহীয়সী নারী রাবেয়া বসরীর নামে।

একই ধারাবাহিকতায় সেলিমুল্লাহ এবং আমেতু মালিক দম্পতির কন্যাসন্তানের নামও রাখা হয় তৈয়বা বেগম। অভিভাবকরা জানান, প্রচণ্ড শীত হলেও তারা নবজাতকদের বুকে আগলে রাখছেন এবং তিনটি সন্তানই সুস্থ আছে।


মন্তব্য