kalerkantho


ঝরে পড়া শিশুদের বিদ্যাপীঠ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঝরে পড়া শিশুদের বিদ্যাপীঠ

রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ইউনিয়নের গাবতল কাতালশাহপাড়া শিশুশিখন কেন্দ্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

 ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগতটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ...’ দূর থেকেই কানে ভেসে আসছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সংকল্প’ কবিতাটি। কাছে গিয়ে দেখা গেল, টিনশেড একটি ঘরে বিভিন্ন বয়সী ২৫ জনের মতো শিক্ষার্থী।

ছোট ছোট চার-চারটি দলে ভাগ হয়ে বসেছে তারা। এ শিক্ষার্থীদেরই একটি দল আবৃত্তি করছিল কবিতাটি। অন্যদের দেখা গেল, আঁকাআঁকি-লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। কেউ আবার কোনো কিছু বুঝতে না পারলে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করছে, ‘ম্যাডাম এটা কী?’ ম্যাডামও হাসিমুখেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন সব।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গাবতল কাতালশাহ পাড়ার পাহাড়ে ২৬৮নং শিশু শিখন কেন্দ্রের চিত্র এটি। ঢাকা আহছানিয়া মিশন পরিচালিত ডাম-সিএলসি প্রকল্পের মাধ্যমে শিশু শিখন কেন্দ্রটিতে মাল্টিগ্রেড পদ্ধতিতে পড়ানো হয়। বিদ্যালয়গামী অথচ ঝরেপড়া, সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের নিয়ে কাজ করা ঢাকা আহছানিয়া মিশন রাঙ্গুনিয়া উপজেলার অনুন্নত গ্রামে ৬৫টি শিশু শিখন কেন্দ্র পরিচালনা করছে। উপজেলায় মাল্টিগ্রেড পদ্ধতিতে ৬৫ কেন্দ্রের মাধ্যমে একযোগে চলছে শিশুদের ঝরেপড়া রোধে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম। গ্রামের ভাড়া করা ছন-বাঁশ-টিনের স্কুল ঘরগুলোর কাঁচা মেঝেতেই শিশুরা সুশৃঙ্খলভাবে ক্লাস করছে।

বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সুন্দর আচরণে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। এতিম পিছিয়ে পড়া ও ঝরেপড়া শিশুদের কাছে এখন আদর্শ বিদ্যাপীঠ ৬৫টি শিখন কেন্দ্র।

ডাম-সিএলসি প্রকল্পের সুপারভাইজার সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের আওতায় ৬-১৪ বছর বয়সী সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম এলাকায়। ‘রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৬৫টি শিশু শিখন কেন্দ্রের মাধ্যমে ৮২৩ ছাত্র এবং ১ হাজার ৭৮ ছাত্রীকে পাঠদান করা হয়। ব্যতিক্রমধর্মী মাল্টিগ্রেড শিক্ষা শিখন পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন জানান, একই শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠ পরিক্রমার একটি ব্যবস্থা হলো মাল্টিগ্রেড। মূলত সুবিধাবঞ্চিত স্কুল বহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা। এটি ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ায় দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

‘এই পদ্ধতিতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বা পর্যায় অনুযায়ী দলগতভাবে পাঠ পরিচালনা করে থাকেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষক একই সঙ্গে একের অধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ান। ফলে শিক্ষককে শিক্ষার্থী সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হয়। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। যেটা পাঠের ক্ষেত্রে খুবই কাজে দেয়। ’-যোগ করেন তিনি।

ঢাকা আহছানিয়া মিশনের এরিয়া ম্যানেজার মো. আলমগীর হোসাইন বলেন, ‘আমরা প্রথমে ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর হার কেমন। আর্থিক অসচ্ছলতা, স্থানান্তরিত হওয়া, পরীক্ষাভীতিসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে কিংবা স্কুলে যায় না। এরপর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলি। অভিভাবকদের বুঝিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষাকেন্দ্রে আনা হয়। একেকটি কেন্দ্রে ২৫ জন বাচ্চাকে ভর্তি করানো হয়। একজন করে নারী শিক্ষক থাকেন। তিনি দৈনিক তিন ঘণ্টা বাচ্চাদের শেখান। মাল্টিগ্রেড পদ্ধতি শেখানো হয় বলে এখানে বাচ্চাদের পড়া নিয়ে ভয়ডর আর থাকে না। আর যেকোনো কিছু শিশু নিজে করে করে শেখে। ফলে শিক্ষাটা তার জীবনে স্থায়ী হয়। ’

রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ইউনিয়নের গাবতল কাতালশাহ পাড়ার পাহাড়ে শিশু শিখন কেন্দ্রে দেখা যায়, ২০ হাত লম্বা একটি দোচালা টিনের ঘর। ঘরটির ভেতর ২৫ জন শিশু। সবাই চার সারিতে বসে পড়ালেখা করছে। ছেনোয়ারা নামের একজন শিক্ষক ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। এ শিখন কেন্দ্রের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আমেনা, শাহিনুর, পারভীন ও জুনায়েদ জানায়, শিশু শিখন কেন্দ্রে পড়তে তাদের ভালো লাগে। কারণ বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হেঁটে যেতে তাদের কষ্ট হয়। সরকারি প্রাইমারি স্কুল দুরে হওয়ায় পাহাড়ি এলাকার এই শিশু শিখন কেন্দ্রে বাচ্চাদের পড়াতে পেরে স্থানীয়দের মাঝেও উৎসাহ দেখা যায়।

কেন্দ্রটির পরিচালনা কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ডাম-সিএলসি প্রকল্প শেষ হয়ে গেলেও আমাদের শিশুদের জন্য এই শিখন কেন্দ্রটি চালু রাখতে হবে। প্রয়োজনে আমরা গ্রামবাসী মিলে চাঁদা দিয়ে মাল্টিগ্রেড পদ্ধতির এই শিশু শিখন কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে চালু রাখব। ’ 

শিক্ষক ছেনোয়ারা বেগম জানান, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি ও অভিভাবকগণ শিশুদের মূল্যায়ন দেখতে আসেন এবং খোঁজ-খবর নেন। সংস্থাটি এ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনসহ কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করেছে।

পূর্ব সরফভাটা মরহুম বজল আহমদ শিশু শিখন কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সভাপতি এনায়েতুর রহিম বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা বিদ্যালয়টি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি। অনেক স্বপ্নের মাঝে আমরা এলাকার প্রতিটি শিশুর হৃদয়ে শিক্ষার আলো জ্বেলে দেওয়ার স্বপ্নও দেখি। ঝরেপড়া শিক্ষাবিমুখ শিশুদের কাছে এখন আদর্শ শিক্ষার বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে শিখন কেন্দ্রটি। ’

ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরী মিল্টন বলেন, ‘আহছানিয়া মিশনের এই কার্যক্রম দুর্গম পাহাড়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। আমার ইউনিয়নের সব কটি শিখন কেন্দ্রের কার্যক্রমের খবর রাখছি। শিশু শিখন স্কুলগুলো যাতে স্থায়ী রূপ পায় সেজন্য সার্বিক সহযোগিতা থাকবে। ’


মন্তব্য