kalerkantho


১০৮ বছরে জব্বারের বলীখেলা

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



পহেলা বৈশাখ উদযাপনের পর পরই চট্টগ্রামে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন আরেকটি উৎসবের। ঘরের বউ-ঝিরা বসে থাকেন একটি মেলার জন্য, যেখান থেকে পুরো বছরের গৃহস্থালি পণ্য কিনেন তাঁরা। আর ক্রীড়াপ্রেমীদের অপেক্ষা বলীদের জমজমাট লড়াই দেখার। আগামী সোমবার শুরু হচ্ছে সেই উৎসব। এর পরদিন বসবে ঐতিহাসিক জব্বারের বলীখেলা। লিখেছেন : রাশেদুল তুষার

 

নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশু সবার বছরব্যাপী অপেক্ষার যবনিকা টানতে আগামী ১২ বৈশাখ (২৫ এপ্রিল) মঙ্গলবার বসছে ঐতিহাসিক জব্বারের বলীখেলা। ওই বলীখেলা উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরীর লালদিঘির মাঠকে কেন্দ্র করে আশপাশের প্রায় তিন থেকে চার বর্গ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে আগের দিন সোমবার থেকে তিনদিন বসবে বৈশাখীমেলা। এবার বসছে বলীখেলার ১০৮তম আসর। মেলা ও খেলা সফল করতে প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে।

আয়োজকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে ১৯০৯ সালে স্থানীয় বদরপতি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ওই কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখীমেলার আয়োজন করেন। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারেই এ খেলার নামকরণ হয় ‘জব্বারের বলীখেলা’।

স্থানীয় আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আয়োজক কমিটির সভাপতি জহরলাল হাজারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেলা ও খেলা সফল করতে বেশ কয়েকটি প্রস্তুতি সভা হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৫০ থেকে ৬০ জন বলী খেলায় অংশ নিতে যোগাযোগ করেছেন। শেষপর্যন্ত যে কজন বলী নাম নিবন্ধন করবেন সেখান থেকে আমরা বাছাই করব প্রতিযোগী। ’

মেলার মূল আকর্ষণ বলীখেলার মূলমঞ্চের আশেপাশে প্রচণ্ড ভিড় থাকার কারণে মেলায় আগতদের বেশির ভাগ খেলা দেখার সুযোগ পান না। তাই এবার প্রথমবারের মতো লালদিঘির মূল মঞ্চের বাইরে বিশাল পর্দায় সরাসরি খেলা দেখার ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানান জহরলাল হাজারী।

তবে বলীখেলার ভবিষ্যৎ আকর্ষণ নিয়ে কিছুটা হতাশ মনে হলো অন্যতম এই আয়োজককে। এর মূল কারণ ভালো বলীর অভাব। জহরলাল হাজারী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভালো বলী আসছে না। এক দিদার বলীই শাসন করছেন গত ১৬ বছর ধরে। সেই দিদারও এবার অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে বলীখেলার আকর্ষণ আরও হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। পুলিশে কিংবা পার্বত্য এলাকায় ভালো কুস্তিগীর আছে বলে জানি। কিন্তু তাঁরা কেন আসছেন না সেটা বোধগম্য নয়। যাঁরা আসেন তাঁরা মূলতঃ অকেশনাল। ’ এ কারণে আগামীতে পুলিশ, আনসার, তিন বাহিনীর কুস্তিদলকে খেলোয়াড় পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার চিন্তাভাবনার কথাও জানালেন তিনি। মেলা তিন দিনের হলেও এই উৎসবের মূল আকর্ষণ দ্বিতীয় দিনের বলীখেলা। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ (২৫ এপ্রিল) বিকেল ৪টা থেকে শুরু হয় এই বলীখেলা।

আর খেলার জৌলুশ আরও বাড়াতে আগে পরে তিনদিন ধরে চলে বৈশাখী মেলা। নগরীর লালদিঘির মাঠ ঘিরে আশপাশের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বসে মেলা। মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হরেক রকম পসরা নিয়ে ভিড় করেন দোকানিরা। আন্দরকিল্লা থেকে কোতোয়ালী মোড়, আসাদগঞ্জ থেকে সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত চলে মেলার বেচাবিক্রি। বিক্রি হয় হাতপাখা, শীতল পাটি, মাটির কলস, চুড়ি, ফিতা, রঙিন সুতা, হাতের কাঁকন, নাকের নোলক, মাটির ব্যাংক, ঝাড়ু, খেলনা, ঢোল, বাঁশি, বাঁশ ও বেতের নানা তৈজসপত্র, কাঠের পুতুল, নকশী কাঁথা, প্লাস্টিক, মুড়ি মুড়কি, লাড্ডুসহ নানা সামগ্রী। লালদিঘি মাঠে থাকে সার্কাস, মৃত্যুকূপ, যাত্রাসহ বিভিন্ন আয়োজন।

গৃহস্থালি সামগ্রীর পাশাপাশি ঘর সাজানোর হরেকরকম জিনিসপত্র পাওয়া যায় বলে এই আয়োজনের অপেক্ষায় থাকেন অনেকে। শিশুদেরও আনন্দের কমতি থাকে না মেলা ঘিরে। এখানে মেলে শিশুদের খেলাধুলার বিভিন্ন পসরা। দোকানিদের অনেকে বংশ পরম্পরায় অংশ নিয়ে থাকেন মেলায়।

কে এই আবদুল জব্বার?

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার প্রবক্তা আবদুল জব্বার ছিলেন মরহুম গোলাম রসুল সওদাগরের ছেলে। নগরীর বদরপাতি এলাকার বাসিন্দা আবদুল জব্বার সওদাগর বকশীর হাটের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। খ্যাতিমান ব্যবসায়ী গোলাম রসুলের প্রথম স্ত্রীর পাঁচ সন্তানের একজন জব্বার। আবদুল জব্বার চার ছেলে-চার মেয়ের জনক ছিলেন। দাদা জব্বার প্রসঙ্গে খুব বেশি তথ্য জানা নেই নাতি শওকত আনোয়ার বাদলের। বলেন, ‘দাদা জব্বার ছিলেন স্বাধীনচেতা যুবক ও স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। তত্কালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছিল। এ আন্দোলন বেগবান করার লক্ষ্যে আবদুল জব্বার চিন্তা করলেন, দেশে শক্তিবান যুবসমাজ তৈরি করতে হবে।

এজন্য প্রতিযোগিতা দরকার। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই তিনি ১৩১৬ বঙ্গাব্দের ১২ বৈশাখ (১৯০৯ সাল) প্রথমবারের মতো চালু করেন বলীখেলা। এই খেলা চালুর পেছনে শুধু বিনোদন নয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শক্তিবান যুবসমাজকে সৃষ্টির একটি চিন্তাও দাদার মাথায় ছিল। সেই বলীখেলাটি এখন চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ’

খ্যাতিমান দাদার কোনো স্মৃতি না থাকায় দুঃখ করে বাদল বলেন, ‘শুনেছি মরহুম দাদা ফর্সা ও লম্বা গড়নের মানুষ ছিলেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু তারিখও জানা নেই। একটি ছবি থাকলে সেটি বাঁধাই করে রাখতাম। ’

সাহিত্যিক আবদুল হক চৌধুরী তাঁর ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আবদুল জব্বারের পূর্বপুরুষ ছিলেন চট্টগ্রামের সুপ্রসিদ্ধ মল্ল পরিবারের উত্তরাধিকারী। চট্টগ্রামের ১৯টি মল্ল পরিবারের বসতি ছিল। মল্লযুদ্ধে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সুপ্রাচীনকালের।

পরবর্তীতে চট্টগ্রামে মল্লা বলী ও বলীখেলা খ্যাতি লাভ করে। তবে কবে খ্যাতি লাভ করেছে সেই সময়কাল জানা যায়নি। ’


মন্তব্য