kalerkantho


উদ্যোক্তা

লেকি চাকমার নকশা করা পোশাক বিদেশেও যায়

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



লেকি চাকমার নকশা করা পোশাক বিদেশেও যায়

তাঁর নকশা করা পোশাক ও হাতে তৈরি পণ্যের কদর দিন দিন বাড়লেও পুঁজির অভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্থানীয়দের মন জয়ের পর বিদেশেও যায় লেকি চাকমার নকশা করা পোশাক। তাঁর পোশাক ও হাতে তৈরি পণ্যের কদর দিন দিন বাড়লেও পুঁজির অভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।

এই নারী উদ্যোক্তার বাবার বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলা সদরের কমলছড়িতে। তবে তিনি মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন দীঘিনালার মাস্টারপাড়া ও তুলাপাড়ায় থেকে। বাবা প্রিয় কুমার চাকমা ছিলেন শিক্ষক। এখন থাকেন শহরের নিউজিল্যান্ড এলাকায়। শিশুবয়স থেকে নকশা করা পোশাকে দুর্বল ছিলেন লেকি চাকমা। ব্যতিক্রমী কিছু করতে মন আনচান করত। এক পর্যায়ে গ্রামের বাড়ির একপাশে বারান্দা নামিয়ে হাতের কাজ শুরু করেন। ১৯৯৮ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিমল কান্তি চাকমাকে বিয়ে করেন। তাঁর সঙ্গে চলে যান ঢাকায়। কাজ নেন একটি পোশাক কারখানায়। কাজে বিশেষ পারদর্শিতায় অল্প সময়ের মধ্যে একটি বায়িং হাউসে ল্যাব টেকনিশিয়ান পদে নিয়োগ পান। এর পর সন্তানের মা হয়ে খাগড়াছড়ি ফিরে আসেন। ২০১১ সালের দিকে ছোট্ট পরিসরে খাগড়াছড়ি শহরের বাড়িতেই শুরু করেন ব্যবসা।

খুব কম সময়ের মধ্যে লেকি চাকমার ব্লক-বুটিক ও নকশার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে যায় এলাকায়। মাত্র ২/৩ বছরে তাঁর কাছে পোশাকের চাহিদা আসতে শুরু করে সুদূর সিঙ্গাপুর, ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে। বিশেষ করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পোশাক ব্যবসায়ীরা ব্লক-বুটিকের অর্ডার নিয়ে আসেন নিয়মিত। বেচাকেনায় রেকর্ড হয়েছে মাসে কোটি টাকায়। লাভ হয়েছে ২০/৩০ লাখ টাকা। তাই চাহিদামতো পোশাক সরবরাহ করতে হোঁচটও খেতে হয় বিভিন্ন সময়ে। তাঁর কারখানায় কাজ করতেন ১৮/২০ জন শ্রমিক। লেকি চাকমা জানালেন, সেই অবস্থা এখন আর নেই। তবে মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। কারণ হিসেবে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক প্রতারণায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাঁরা আমার নকশা নকল করে নিজেরাই পোশাক বানিয়ে বাজারজাত করছেন। ’

জানা যায়, তিনি কাজও শেখান অন্য নারীদের। তাঁর কাছে কাজ শিখে এলাকার অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। লেকি চাকমা ব্লক-বুটিকের প্রশিক্ষক। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও যুব উন্নয়নের অধীনে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাসে আয় করেন ২০ হাজার টাকা। এছাড়া বিভিন্ন এনজিওর প্রশিক্ষণে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে জেলা সদরে ঘণ্টায় ৫০০ আর জেলা সদরের বাইরে হলে ১০০০ টাকা সম্মানি পান।  

উদ্যমী নারী লেকি চাকমা জানান, ব্যবসার আয় দিয়ে খাগড়াছড়ি শহরের নিউজিল্যান্ডে চার শতক জমি কিনেছেন। সেখানে চালু আছে ‘নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন অ্যান্ড বুটিক হাউস’। ব্লক ও বুটিকের ওপর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। খুব সহসা সেটি চালু করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি বাসার পাশেই তিনি একটি রেস্টুরেন্টও চালু করেছেন।

নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে স্বীকৃতিও পেয়েছেন লেকি চাকমা। ২০১৫ সালে সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ জয়িতা’ সম্মাননা পান। জেলা পর্যায়ে একই বছরে ‘জয়িতা’ নির্বাচিত হন। জেলা সদরে নিউজিল্যান্ড নারী কল্যাণ সমিতির সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

দুই ছেলে সন্তানের মা লেকি চাকমার স্বামী বিমল কান্তি চাকমা এনজিও সংগঠক। তিনি বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের অনেক সহায়তার কথা শোনা গেলেও পাহাড়ে তা নেই। ফলে লেকি চাকমার মতো উদ্যোগী নারীরা এগিয়ে যেতে নানা বাধার মুখে পড়েন। ’

লেকি চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে আছে অনেক ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা। অনেকে তাঁত, ব্লক-বুটিকসসহ নানা হস্তশিল্প ও ছোট ব্যবসায় এগিয়ে এসেছেন। অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তার উন্নয়ন ও বিকাশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। ভালো কিছু করার পথে অর্থই বড় বাধা। ’

‘আদিবাসীদের বিলুপ্তপ্রায় অথচ সম্ভাবনময় কোমর তাঁতশিল্প বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ঋণ সহায়তা চাই। ’ যোগ করেন তিনি।

বিসিকের খাগড়াছড়ির সমপ্রসারণ কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘কোমর তাঁতে তৈরি বিভিন্ন পাহাড়ি পরিধেয় পোশাক, সুয়েটার ও ব্লক-বুটিকের কাপড়সহ হস্তশিল্পের বিশেষ কদর রয়েছে। তবে নানা সীমাবদ্ধতায় নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভব হচ্ছে না। ’

খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক শেফালিকা ত্রিপুরা মনে করেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ চাইলেই নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে।


মন্তব্য