kalerkantho

ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ

জয়নাবের লন্ডনজয়

আসিফ সিদ্দিকী   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জয়নাবের লন্ডনজয়

... স্কুলের সাধারণ শ্রেণিকক্ষকে ডিজিটাল রূপ দিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন জয়নাব আরা বেগম। তিনি নগর কিংবা জেলা সদর নয়, বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম এলাকার মাংতাই হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মুকুট। এছাড়া ২০১৪ সালে সরকারের মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি। এর আগে ২০১২ সালে বান্দরবান জেলা পর্যায়ে স্কাউটে সেরা শিক্ষক হন। এর পরের তিন বছর হয়েছিলেন বান্দরবান জেলার সেরা শিক্ষকও ...

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্ল্যাক বোর্ড ও চক-ডাস্টারের সেই চিরচেনা শ্রেণিকক্ষকে ডিজিটাল রূপ দিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন দুর্গম এলাকার প্রাথমিক শিক্ষক আলীকদমের জয়নাব আরা বেগম। জয় করেছেন লন্ডন! যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মুকুট।

এই অসাধ্য সাধন করেছেন যিনি, তিনি নগর কিংবা জেলা সদর নয়, বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম এলাকার মাংতাই হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ওই বিদ্যালয়ে ২০০৩ সালের ৬ জুন শিক্ষকতা শুরু করেন জয়নাব। চাকরির বয়স যখন ১০ বছর, তখন প্রথমবারের মতো সরকারের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিষয়ক ১২ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণে নোয়াখালীর হাতিয়ার প্রাথমিক শিক্ষক মাছুমা আকতারের ভিডিও কন্টেন্ট শ্রেষ্ঠ হয়।

এটি দেখে উদ্ধুদ্ধ হন তিনি। ‘হাতিয়ার মতো দ্বীপ থেকে শ্রেষ্ঠ পদক জিততে পারলে আলীকদম থেকে কেন নয়! সেই থেকে আমার জেদ শুরু। ’-বলেন জয়নাব।

নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে এক বছরের মধ্যে প্রচুর ব্যতিক্রমী মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট সরকারের ‘শিক্ষক বাতায়ন’ ওয়েবপেজে যোগ করতে থাকেন তিনি। এরই মধ্যে বেশ কিছু কন্টেন্ট নজর কাড়ে সংশ্লিষ্টদের। উত্সাহ আরো বেড়ে যায় জয়নাবের। ২০১৪ সালে সরকারের মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা শিক্ষক নির্বাচিত হন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ‘সেরা শিক্ষক অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেন তাঁর হাতে। অবশ্য এর আগে ২০১২ সালে বান্দরবান জেলা পর্যায়ে স্কাউটে সেরা শিক্ষক হন তিনি। এর পরের তিন বছর পর পর তিনবার বান্দরবান জেলার সেরা শিক্ষক হন জয়নাব।

মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট প্রতিযোগিতায় অবাক করা ঘটনাটি হলো, ফাইনালে হাতিয়ার সেই শিক্ষিকার সঙ্গেই জয়নাবের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। জয়নাব বলেন, ‘যাঁর কন্টেন্ট দেখে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম, তিনিই আমার ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী। সেটি আমার বড় অর্জন এবং পুলকিত হওয়ার বড় বিষয়। ’

জাতীয় পর্যায়ে জয়ের পর থেকে জয়নাব তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চক ডাস্টারের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে লাইটিং, রঙ, চিত্র ও ভিডিও ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠদানকে ব্যতিক্রমী ও আনন্দদায়ক করা অর্থাৎ মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের দিকে বেশি মনোযোগ দেন তিনি। সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে শুরু হয় বড় জয়ের আকাঙ্ক্ষা।

জানা গেছে, ২০১৪ সালে কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলিয়ে দেশের ৪০ শিক্ষককে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন একসেস টু ইনফরমেশন (এ টু আই) পক্ষ থেকে ‘সেরা শিক্ষক’ পুরস্কার দেওয়া হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় ওই ৪০ শিক্ষককে বিশ্বের ৪০ দেশের ৪০ স্কুলের সাথে পার্টনারশিপ ভিত্তিতে ‘অনলাইন স্কুলিং’ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে একজন শিক্ষক নিজ দেশের প্রেক্ষাপটে শ্রেণিকক্ষের কন্টেন্ট তৈরি করে অন্য দেশের স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে শেয়ার করবেন।

এর আওতায় লন্ডনের হর্নচার্চের স্কটস প্রাইমারি স্কুলের সঙ্গে জয়নাবের চম্পটপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘স্কুলস অন লাইন পার্টনারশিপ’ কার্যক্রম শুরু হয়। একইসাথে জয়নাবের বড় জয়ের স্বপ্ন বুননও শুরু হয়। এক বছর ধরে চলা শেয়ারিংয়ে জয়নাবের কন্টেন্ট অসাধারণ হওয়ায় ২০১৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যাওয়ার্ড (আইএসএ) জিতে চম্পটপাড়া বিদ্যালয়। সেই বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলিয়ে ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘আইএসএ অ্যাওয়ার্ড’পায়। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার একটি ও আরেকটি হলো চম্পটপাড়া বিদ্যালয়।

পদকটি গ্রহণের জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণে ও আর্থিক সহযোগিতায় ২০১৫ সালের ৫ থেকে ২১ জুলাই লন্ডন সফর করেন জয়নাব। লন্ডনের স্কটিস প্রাইমারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অতিথিদের সামনে মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট উপস্থাপন করেন তিনি।

জয়নাব বেগম বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষের জন্য জাতীয় দিবস, জাতীয় প্রতীক, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শ্রেণিকক্ষ সাজানো, পানি, চাল ও চারুকলাসহ আট বিষয়ে কন্টেন্ট তৈরি করি। এর মধ্যে বীজবপন থেকে শুরু করে উৎপাদন খাবার হিসেবে চালের ব্যবহার পর্যন্ত বিস্তারিত কন্টেন্ট বেশ সাড়া মেলে। একইসাথে পানির উৎস, দূষণ ও ব্যবহার বিষয়ক কন্টেন্ট ব্যাপক সাড়া পায়। ’

পরে লন্ডনের মেয়র ভবনে হেভারিং টাউন হলে সিটি মেয়র ইগলিং ও তাঁর স্ত্রী, কাউন্সিলর এবং সেই পার্টনার স্কুল শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ব্রিটেনের রানির পোশাক পরিয়ে সম্মাননা দিয়ে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয় জয়নাবকে।

জয়নাব বলেন, ‘সেই অনুষ্ঠানে বিশাল কক্ষে আমি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রাথমিক শিক্ষা ও ডিজিটালাইজেশন এবং আমার বিদ্যালয় নিয়ে ৫৫ মিনিটের একটি ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করি। ’

জয়নাবের স্কুল শেয়ারিংয়ের পার্টনার স্কটিস প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক জ্যাকি ব্রাডম্যান বলেন, ‘আমার স্কুলের শিক্ষার্থীরা জয়নাবের স্কুল, শিক্ষার্থী, দেশ ও তাঁর সম্পর্কে জানতে খুব আগ্রহী ছিল। সেই আগ্রহ পূরণ হয়েছে। এটা অত্যন্ত মূল্যবান ভিজিট। এতে দুই স্কুল খুবই উপকৃত হয়েছে। ’

আর লন্ডনের মেয়র ইগলিং বলেন, ‘এই টাউন হলে জয়নাব আসায় আমরা আলোকিত হয়েছি। এতে দুই দেশের দুই স্কুল খুব উপকৃত হয়। ’

জয়নাব বলেন, ‘পদক অনুষ্ঠানের সিডিউল পরিবর্তন হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ সিদ্দিকী উপস্থিত থাকতে পারেননি। পরে আপমিনিস্টার এলাকা থেকে প্রাইভেট বিমানে লন্ডন শহরে পার্লামেন্ট ভবনে নেওয়া হয় আমাকে। সেখানে স্পিকারের চেয়ারে বসিয়ে আমাকে বিরল সম্মাননা দেওয়া হয়। ’

বর্তমানে ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত ‘ওয়ার্ল্ড ভয়েজ’ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এ টু আই পরিচালিত ‘মুক্তপাঠ’ এর অ্যাম্বেসেডর হিসেবে কাজ করছেন জয়নাব। তাঁর জীবনের কাহিনি নিয়ে একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘সমর্পিত শব্দাবলী’।

এক কন্যার জননী জয়নাব বলেন, ‘আমার সফলতার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রয়েছে স্বামী শফিকুল ইসলামের। তাঁর পূর্ণ সহযোগিতা না পেলে এই অর্জন সম্ভব হত না। একইসাথে বাবা জয়নাল আবেদিনের অনুপ্রেরণা এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সহযোগিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। আর স্কুলের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা তো আমার প্রাণ। তাদের ঘিরেই আমার সব স্বপ্ন। ’

তিনি জানান, বিদ্যালয়ে প্রতিদিন সাতটি ক্লাসের মধ্যে ৩/৪টি ক্লাস মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে নেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন, শতভাগ ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ করা।

জয়নাব চকরিয়ার দক্ষিণ কাকারা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, কাকারা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং চকরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। কাকারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল গণি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৯৫ সালে জয়নাব প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেছিল। মেধার পাশাপাশি তার এক্সট্রা কারিকুলাম বেশ ভালো ছিল। তাঁর এই অর্জন সত্যিই আমাদের জন্য গর্বের। ’ আলীকদম উপজেলা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, ‘পাহাড়ি জনপদ শিক্ষায় কতটা এগিয়েছে জয়নাবই এর প্রমাণ। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর এই সাফল্য পুরো পাহাড়ি জনপদে প্রেরণা জোগাবে। ’


মন্তব্য