kalerkantho


অযত্নে অবহেলায় পাহাড়ি শিশু

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অযত্নে অবহেলায় পাহাড়ি শিশু

যে বয়সে শিশু মায়ের আদর-ভালোবাসা আর স্নেহে বেড়ে ওঠার কথা, সেই সময়ে ধুঁকছে অযত্ন-অবহেলায়। জীবনের তাগিদে পরিবারের সবার আহার জোটাতে ওদের বাবা-মা দুজনেই থাকেন দিনভর ব্যস্ত।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাহাড়ি পাড়াগুলোর শিশু ও নারীর জীবনচিত্র এমনই। উপজেলার খৈয়াছড়া, সদর ও করেরহাট ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৬০০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের বসবাস। তাঁদের অধিকাংশ ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের। মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তালবাড়ীয়া এলাকার চৌধুরীপাড়া ও রিজার্ভপাড়ায় মোট ১০০ পরিবারের বসবাস। সেখানে এক থেকে ছয় বছরের অন্তত ২০০ শিশু রয়েছে। এরা পাড়ার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অযত্নে বেড়ে ওঠছে। তাদের জন্য নেই পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নেই চিকিত্সাও। দিনের অধিকাংশ সময় ওদের মায়েরা কাজে থাকার কারণে এক থেকে দুই বছরের শিশু মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত।

চরম পুষ্টিহীনতার কারণে ওরা ভুগছে নানা রোগব্যাধিতে।

তালবাড়ীয়াপাড়ার বাসিন্দা চিত্রলক্ষ্মী ত্রিপুরার শিশু সন্তানদের বয়স এক ও তিন বছর। শাশুড়ির কাছে দুই সন্তানকে রেখে প্রতিদিন তিনি কাজে যান। ফিরেন বিকেলে। ততক্ষণ তাঁর সন্তানদের মুখে খাবার ওঠে না।

চিত্রলক্ষ্মী ত্রিপুরা জানান, তাঁর স্বামী ও তিনি প্রতিদিন কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়েই সংসারের সবার খাবার জোটে। একদিন কাজে না গেলে না খেয়ে থাকতে হয়। অথবা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার নিতে হয়। শিশুদের স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রায় অসুখ-বিসুখ হয় ওদের। আশেপাশে ডাক্তার না থাকায় চিকিত্সা করানো হয় না। অনেক সময় টাকার জন্যও ওষুধ কেনা যায় না। ’

মিরসরাই উপজেলা ত্রিপুরা কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র ত্রিপুরা জানান, তালবাড়ীয়া এলাকায় এখনো শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। এ জন্য এই পাড়ার মানুষ অনেক পিছিয়ে। শিশুদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁদের জানার আগ্রহ কম। মাঝে মাঝে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন এসে শিশুদের ব্যাপারে মাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয় না।

করেরহাট ইউনিয়নের সাইবেনিখীল ও কয়লাপাড়ায় অন্তত ৩০০ পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারে রয়েছে দুই শতাধিক শিশু। তাদের অধিকাংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অবশ্য কয়লাপাড়ার শিশুরা স্থানীয় স্বাস্থ্য উপ-কেন্দ্রের চিকিত্সা সেবা পেয়ে থাকে।

সাইবেনিখীলপাড়ার সর্দার রুপাইধন ত্রিপুরা জানান, পড়ালেখা না জানার কারণে পাড়ার অধিকাংশ নারী কুসংস্কারে বিশ্বাসী। এছাড়া সন্তানের প্রতি মমতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজের জন্য তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ জন্য নিজেদের শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে তাঁরা সচেতন নন। সবসময় এই পাড়ার শিশুদের রোগব্যাধি লেগেই থাকে।

অবশ্য পাড়ার বাসিন্দা ঊষা ত্রিপুরা শোনালেন আশার কথা। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে অধ্যাপক ডা. জাসমেদ আলম, আমেরিকা প্রবাসী রিদোয়ান ও সাংবাদিক শারফুদ্দীন মিলে পাড়ায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর থেকে পাড়ার নারীরা অনেকটা সচেতন হয়ে উঠছেন। ’

মিরসরাইয়ের শেফা ইনসান হাসপাতালের পরিচালক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এস এ খান ফারুক বলেন, ‘ওই এলাকার পাহাড়ি শিশুদের ভিটামিন এ, বি ও সি এর অভাব আছে। ওদের দরকার পুষ্টি জাতীয় খাওয়ার। যা তারা পায় না। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক থেকে দু্ই বছরের শিশুরা মায়ের দুধ থেকেও বঞ্চিত হয়। এটা শিশুদের জন্য আরো মারাত্মক। এসব বিষয়ে পাহাড়ি পরিবারকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ’

সদ্য যোগ দেওয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল খালেক বলেন, ‘পাহাড়ি বাচ্চাদের পুষ্টিহীনতারোধে বিশেষ কোনো প্রকল্প আছে কিনা তা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। তবে শিশুদের পুষ্টিহীনতা রোধে সবচেয়ে বেশি দরকার মায়েদের এ বিষয়ে সচেতনতা। ’


মন্তব্য