kalerkantho


২৯ বছরেও পূর্ণতা পায়নি নিজকুঞ্জরা শিল্পনগরী

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



২৯ বছরেও পূর্ণতা পায়নি নিজকুঞ্জরা শিল্পনগরী

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ নানা সমস্যার কারণে ২৯ বছরেও পূর্ণতা পায়নি ছাগলনাইয়ার নিজকুঞ্জরা শিল্পনগরী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কের সমিতি বাজার এলাকায় গড়ে ওঠা এ শিল্পনগরী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তরা। লোকসানের মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি কারখানা। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেকে শিল্প ইউনিট বরাদ্দ নিয়েও চালু করতে পারেননি।

এদিকে বিসিক এলাকায় সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়েছে। সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। যেসব প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে চালু রয়েছে তাও বিসিক কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। উন্নয়ন সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলের দিকে সঠিক নজর দিলে সরকারের রাজস্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে সংশিষ্টরা মনে করেন।

নিজকুঞ্জরা বিসিক শিল্পনগরী এলাকা ঘুরে জানা যায়, ১৯৮৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর তত্কালীন বিমানবাহিনীর প্রধান সুলতান মাহমুদ উদ্যোগ নিয়ে তাঁর নানার বাড়ি এলাকা নিজকুঞ্জরা গ্রামে ১৭ একর জায়গার উপর গড়ে তুলেন বিসিক শিল্পনগরী। এ জমিতে তৈরি করা হয় ৪৪টি শিল্প ইউনিট। মাত্র ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকায় এক একর জায়গা ইজারা দেওয়া হয়। বর্তমানে এর ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে একর প্রতি ১ কোটি ১১ লাখ টাকা। মাঝারি শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের মাঝে ৯৯ বছরের জন্য ইউনিট ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু গ্যাসের অভাবে এখনো ১৮টি শিল্প ইউনিটে কোনো কারখানা চালু করা যায়নি। গ্যাস সংযোগ হবে-হচ্ছে বলে বছরের পর বছর ঘুরেও তা হয়ে ওঠেনি। এতে লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে উদ্যোক্তারা। উপায় না দেখে অনেকে ব্যবসার ধরন পাল্টানোরও উদ্যোগ নিচ্ছেন।

শিল্প উদ্যোক্তা মেসার্স আলীম এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. সিরাজ উদ্দিন জানান, হোমিও ওষুধের বোতল ও মারবেল তৈরির জন্য তিনি শিল্প ইউনিট বরাদ্দ নেন। কারখানায় গ্যাস সংযোগের জন্য ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট ৮ লাখ ৮৮ হাজার ১০৫ টাকার জামানত জমা দেন। তাঁর কারখানায় রাইজারও ওঠানো হয়। অথচ এখনো কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। এতে তিনি আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।

বিসিক অফিস সূত্র জানায়, কারখানা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগেই ব্যাংকঋণের যাঁতাকলে পড়ে দেউলিয়া হয়ে যায় ইশরা পেপার অ্যান্ড বোর্ড। এ কারখানা নিয়ে এখনো আদালতে মামলা চলছে।

জমজম সুইটস অ্যান্ড বেকস লিমিটেডের ম্যানেজার আনোয়ার মির্জা জানান, এখানে দিনে-রাতে থাকে লোডশেডিং। কারখানায় পর্যাপ্ত উৎপাদন করা যাচ্ছে না। তাছাড়া, নিরাপত্তার অভাবও রয়েছে। সন্ধ্যার পর ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিসিকের নিজস্ব কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ভালো নয়। স্থানে স্থানে বন্ধ হয়ে গেছে ড্রেনের মুখ। ফলে উপচে পড়া ড্রেনের দুর্গন্ধময় পানিতে উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তাছাড়া নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও নেই। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কথা থাকলেও বিসিক কর্তৃপক্ষ তা করতে পারেনি।

নিটল টাটা মটরসের প্রকৌশলী সোহেল চাকমা বলেন, ‘আমাদের পাশের ক্যাঙারু জুতার কারখানার বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া বর্জ্যের দুর্গন্ধের কারণে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ’ ক্যাঙারু ফুটওয়ার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের জুতার কারখানার বর্জ্য তাঁরা বারইয়ারহাট পৌরসভার গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে দেন।

সিজল ফুডসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান জানান, মহাসড়কের চার লেনের কারণে বিসিকের দুটি সড়কের মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি সড়কটি ভাঙাচোরা। এই অ্যাপ্রোচ সড়কটি ফোর লেন কর্তৃপক্ষ মেরামতের কথা থাকলেও তাঁরা তা করেননি। ফলে বিসিকের ভেতর ভারী কোনো যানবাহন ঢুকতে পারে না। গ্যাস না থাকায় জ্বালানি খরচেও ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল বারী মহসীন বলেন, ‘শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কারণে শিল্প কারখানাগুলো চালু করতে পারছে না মালিকরা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য যদি ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ করতে হয় তাহলে কীভাবে উদ্যোক্তারা শিল্প গড়ে তুলবেন। আমরা যারা বিসিকে প্রথম থেকে আছি তাঁরা না পারছি থাকতে, না পারছি চলে যেতে। ’ তিনি জানান, ৪৪টি কারখানার মধ্যে মাত্র সাতটিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতে আদৌ গ্যাস সংযোগ দেবে কিনা বলা যাচ্ছে না।

সমিতির সভাপতি মো. হুমায়ুন জানান, প্রতিবছর সরকার নির্ধারিত চার্জ পরিশোধ করার পরও বিসিক কর্তৃপক্ষ তাঁদের সুযোগ-সুবিধার প্রতি কোনো নজর দেননি।

 নিজকুঞ্জরা বিসিকের কর্মকর্তা মাহমুদুল হক জানাান, যাঁরা শিল্প কারখানা চালু করেননি তাঁদেরকে শিগগিরই কারখানা চালু করতে বলা হয়েছে। এ নিয়ে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। চালু না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্যাসের বিকল্প ব্যবস্থা নিতেও তাঁদের বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের হেড অফিস থেকে এমন নির্দেশনা এসেছে। আমরা ব্যবসায়ীদের খাত পরিবর্তনও করতে বলেছি। ’ তবে গ্যাস সংযোগ না থাকায় শিল্প উদ্যোক্তাদের ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য প্রাক্কলন পাঠিয়েছি। এছাড়া সড়ক মেরামত এবং বিকল্প সড়ক বের করার বিষয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে। ’

ফেনীস্থ বাখরাবাদ গ্যাসের ব্যবস্থাপক আবু তাহের সিকদার বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কম। শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেছে সরকার। মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে গ্যাস সংযোগ নিতে হবে। ’

ছাগলনাইয়া পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মো. কামাল পাশা বলেন, ‘দুর্গাপুরের নতুন সাবস্টেশন থেকে সরাসরি বিসিকের জন্য ফিডার সংযোগ দেওয়া হবে। এছাড়া আগামী দুই বছরের মধ্যে শুধু বিসিকের জন্য আলাদা সাবস্টেশন করা হবে। এ জন্য আমরা বিসিকের পাশে জমি কেনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি। এতে দূর হবে শিল্পনগরীর বিদ্যুৎ সমস্যা। ’

ফেনী জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, ‘শিল্প মালিক সমিতির সাথে বসেছিলাম। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। সহসা বিসিক পরিদর্শনে যাব। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে এসব ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য