kalerkantho


ভিআইপি ভেঁপু যন্ত্রণা

... ব্যক্তিগত গাড়িতেও ‘ভেঁপু’ বাজতে শোনা যায়। বেপরোয়া গতিতে চলা এসব গাড়ির চালকের আসনে থাকে তরুণ। গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটায় গাড়িগুলো। আর সাধারণ মানুষ পড়েন বিভ্রান্তিতে ...

রশীদ মামুন   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভিআইপি ভেঁপু যন্ত্রণা

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বহনকারী গাড়ির পথচলা নির্বিঘ্ন করতে বহরের আগেভাগে আলাদা গাড়িতে পুলিশ ‘ভিআইপি ভেঁপু’ বাজায়। এছাড়া কর্তব্যরত পুলিশ ও রোগীবাহী এবং দমকল বাহিনীর গাড়িতে ইমার্জেন্সি হর্ন (জরুরি ভেঁপু) ব্যবহারের আইনগত অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ইদানীং নগরীতে ব্যক্তিগত গাড়িতেও সেই ‘ভেঁপু’ বাজতে শোনা যায়। বেপরোয়া গতিতে চলা এসব গাড়ির চালকের আসনে থাকে তরুণ। গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটায় গাড়িগুলো। আর সাধারণ মানুষ পড়েন বিভ্রান্তিতে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না।

রিকশাচালক কলিমুল্লাহ বলেন, ‘সচরাচর ভেঁপু বাজিয়ে পথ চলে পুলিশের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স। ইদানীং দেখছি কম বয়সী কিছু ছেলে কার ও মোটরসাইকেল চালানোর সময় ওই ভেঁপু বাজায়। আমরা প্রথমে পুলিশের গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স মনে করে গাড়িটিকে যেতে দিই। পরে দেখি পুলিশ নয়, রোগীর গাড়িও নয়!’

‘ওরা শুধু ভেঁপু বাজায় না, উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনাও করে। কেমন যেন অস্থির! মাঝে-মধ্যে জোরে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। তবে এসব দুর্ঘটনার বেশি শিকার আমাদের রিকশা। ওরা তো ধনীর দুলাল। আমরা গরিব বলে কোনো প্রতিকার পাই না। ’ বলেন ওই রিকশাচালক।

নগরীর বন্দরটিলা এলাকার বাসা থেকে আগ্রাবাদ চৌমুহনীর অফিসে প্রতিদিন বাসে আসা-যাওয়া করেন সরকারি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম শহীদ। ‘অফিসে আসার সময় সকালে খুব একটা যানজটে পড়ি না।

তবে বিকেলে বাসায় ফেরার সময় প্রতিটি মোড়ে তীব্র গাড়িজটে পড়তে হয়। সাম্প্রতিককালে গাড়িজটের চেয়েও ভেঁপু যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। যানজটে দাঁড়িয়ে আছে সব গাড়ি। কিন্তু কিছু কার ও মোটরসাইকেলে অবিরাম বাজতে থাকে ভেঁপু। যতক্ষণ জ্যাম ছোটে না, ততক্ষণ বেজেই চলে। একসঙ্গে এতো আওয়াজ অসহ্য!’-এভাবেই নিত্যদিনের ভেঁপু যন্ত্রণার কাহিনি শোনালেন শহীদুল।

সম্প্রতি এক দুপুরে ভেঁপু বাজিয়ে সার্কিট হাউসের সামনের সড়ক হয়ে কাজির দেউড়ি মোড় অতিক্রম করছিল বেপরোয়া গতির একটি কার। ওই সময় কাজির দেউড়ি থেকে আসকার দিঘির পাড় সড়কে ছিল গাড়িজট। তাই বাজারের একটু সামনে গিয়ে কড়া ব্রেক কষে দাঁড়াতেই হলো গাড়িটিকে। তবু বন্ধ হয়নি সেই ভেঁপু, বেজেই চলছে। চালকের আসনে বসা টগবগে তরুণ, পাশের আসনে তরুণী।

ভেঁপু কেন বাজাচ্ছেন? তরুণের উত্তর, ‘এটি বাজলে সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। অন্য গাড়ি বিশেষ করে রিকশাগুলো দ্রুত আমাদের যাওয়ার জায়গা করে দেয়। তখন গাড়ি চালাতে অন্য রকম মজা লাগে। ’

অযথা ভেঁপু বাজানো তো বেআইনি, পুলিশ কিছু করে না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কই, এখনো সমস্যায় পড়িনি। প্রায় প্রতিদিনই তো গাড়ি নিয়ে বের হই। কেউ কিছু বলে না। ’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) সুজায়েত ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়িতে ইমার্জেন্সি হর্ন বাজানো অবশ্যই বেআইনি। যারা এটি ব্যবহার করছে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ’

বহদ্দারহাটের বাসিন্দা কলামিস্ট মুহাম্মদ মুসা খান বলেন, ‘নগরে পথচলার সময় প্রায়ই চোখে পড়ে কিছু নতুন মডেলের কার ও মোটরসাইকেল ভেঁপু বাজিয়ে দ্রুতগতিতে গা ঘেঁষে চলে যায়। দুর্ঘটনাও ঘটাচ্ছে এরা। এসব গাড়ির আরোহীর সবাই তরুণ। অনেক সময় তরুণীকেও দেখা যায়। গান-বাজনা করতে করতে গাড়ি চলে। তরুণদের দুয়েকজনকে মাঝে মাঝে মনে হয় নেশাগ্রস্ত!’

তিনি এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আহ্বান জানান।

বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সব ধরনের ভেঁপু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর আওয়াজ মানুষের কানের পর্দায় আঘাত হানে। বিশেষত কোমলমতি শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হয়। এছাড়া স্কুল-কলেজসহ অফিসের কাজের ব্যাঘাত ঘটায়। এক ধরনের আতঙ্কও সৃষ্টি হয়। আর শব্দদূষণ তো আছেই। ’

ডা. জাহাঙ্গীর মনে করেন, প্রয়োজনের তাগিদে বিশেষ সময়ে ভেঁপুর ব্যবহার দরকার হলেও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় মাত্রার অতিরিক্ত ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে হবে।


মন্তব্য