kalerkantho

নারী শ্রমিকের দুঃখগাথা

এ কেমন বাড়িওয়ালা!

রাশেদুল তুষার   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এ কেমন বাড়িওয়ালা!

নগরীর ইপিজেড এলাকায় বাড়িওয়ালাদের হয়রানিতে অতিষ্ঠ পোশাকশ্রমিক। ছবি : কালের কণ্ঠ

... সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। কারণ ওই সময় শ্রমিকরা কারখানায় থাকেন। আর কেউ যদি ছুটি নিয়ে বা অসুস্থ হয়ে দিনে বাসায় থাকতে চান তাহলে তাঁকে ঘরের বাইরেই থাকতে হয় ...

 

১৯৮৩ সালে যখন চট্টগ্রাম নগরীর বন্দরটিলা এলাকায় দেশের প্রথম ইপিজেড গড়ে ওঠে, তখন আশেপাশের পরিবেশ ছিল অনেকটা জনবিরল ফসলের মাঠ। তিন যুগের ব্যবধানে ইপিজেড সংলগ্ন ৩৮ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড নগরীর সবচেয়ে ঘনবসতি এলাকা। শুধু সিইপিজেড এবং দেড় কিলোমিটার দূরের কর্ণফুলী ইপিজেডের শ্রমিকদের কেন্দ্র করে এখানকার অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য নগরীর অন্য যেকোনো এলাকার চাইতে বেশি। যার ৬৫ শতাংশই নারীশ্রমিক।

তবে ইপিজেড সংলগ্ন এলাকার অর্থনীতিকে চাঙা করলেও নিজেরা তেমন একটা ভালো নেই। এই শ্রমিকদের শোষণ করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে সুযোগ সন্ধানীরা। শ্রমিকদের কাছে তাঁরা বাড়িওয়ালা আর নিজেদের পরিচয় দেয় ‘জমিদার’ হিসেবে। ক্ষেত্রবিশেষে ১২০ থেকে ১৪৪ বর্গফুটের একটি কক্ষের ভাড়া হিসাবে মাসে দিতে হচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। শুধু বর্গফুটপ্রতি বাড়িভাড়া হিসাব করলে নগরীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এলাকা এই ইপিজেড।

যেখানে মূলতঃ থাকে নিম্নআয়ের পোশাকশ্রমিক!

নগরীর সল্টগোলা ক্রসিং থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত স্থানীয়দের আয়ের অন্যতম উৎস এখন বাড়িভাড়া। বন্দর এলাকায় দুটি ইপিজেড এবং এর বাইরে কিছু গার্মেন্টে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এসব শ্রমিকের মধ্যে প্রায় দুই লাখ নারী। যাতায়াতের সুবিধার্থে এদের একটি বড় অংশ থাকেন ইপিজেডের আশেপাশের এলাকায়। ব্যাপক চাহিদা থাকায় ছোট এক কিংবা দুই কামরার ঘর তুলে বাড়ির মালিক ভাড়া দিয়েছেন পোশাক শ্রমিকদের কাছে। ঘনবসতি আর চাহিদার কারণে ওই ঘরগুলো হয়ে ওঠছে সোনার হরিণ। নগরীর অন্য এলাকার চেয়ে কক্ষপ্রতি ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা বেশি এখানে। কিন্তু বাড়তি ভাড়া দিয়েও শান্তিতে নেই পোশাকশ্রমিকরা।

ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেডের সুইং অপারেটর আফরোজা আকতার বলেন, ‘প্রতিবছর বেতন বাড়ে পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ হারে। আগে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের আনন্দের চেয়ে বছর শেষ হয়ে এলেই মনে ভর করে বাড়িভাড়া আতঙ্ক। কারণ বেতন বাড়ুক আর না বাড়ুক বছর শেষ হওয়ার আগেই বাড়িওয়ালার কাছ থেকে আসে ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ। বেতন বাড়লেও চোখের সামনে দিয়ে বাড়তি টাকা চলে যায় বাড়িওয়ালার পকেটে। ’

দফায় দফায় অস্বাভাবিক বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে বছর দুয়েক আগে সিইপিজেডের শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন। তাঁদের প্রতিবাদের মুখে শিল্পপুলিশ, বেপজা ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ওই কমিটিও বাড়িভাড়া বৃদ্ধিতে কোনো নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি।

তবে বাড়িভাড়া নিয়ে ইদানীং তেমন অভিযোগ আসে না বলে জানালেন শিল্প পুলিশের চট্টগ্রাম জোনের উপ-পরিচালক তোফায়েল আহমেদ মিয়া।

চট্টগ্রাম ইপিজেডের আশেপাশের এলাকা ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে বাড়ির মালিকদের আচরণের নির্মম চিত্র পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই এলাকার অনেক মালিক সন্তানসহ বাড়িভাড়া দেন না। নাছিমা বেগম নামের একজন গার্মেন্টশ্রমিক বাড়ির মালিকের নাম উল্লেখ না করে অভিযোগ করেন, ‘২০১২ সালে বাচ্চা জন্ম নেওয়ার ১৫ দিন আগে আমাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হয়। অথবা বাড়ি গিয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আসতে বলে বাড়ির কেয়ারটেকার। তাঁরা কোনোভাবেই ছোট শিশুসহ ভাড়াবাড়িতে থাকতে দেবে না বলে আমাদের হুঁশিয়ার করে দেন। ’

আরেকজন নারীশ্রমিক অভিযোগ করেন, ‘সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। কারণ ওই সময় শ্রমিকরা কারখানায় থাকবে। কেউ যদি ছুটি নিয়ে বা অসুস্থ হয়ে দিনের বেলায় বাসায় থাকতে চায় তাহলে তাকে ঘরের বাইরে থাকতে হয়। ’ এছাড়া উঠতে বসতে গালিগালাজ তো আছেই। বিশেষ করে মেয়েদের সাথে খুব অশ্লীল আচরণ করে বলে গার্মেন্টশ্রমিকরা অভিযোগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বন্দরটিলা ও এর আশেপাশে দুটি ইপিজেড ও একাধিক গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান থাকায় ওই এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দার বাইরে আরো দেড় লাখ শ্রমিকের বাস। সুযোগটা নিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা। যে কারণে গার্মেন্ট শ্রমিক অধ্যুষিত এই এলাকার ভাড়াও শহরের অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও জানা গেছে, এই শ্রমিকদের ওপর ভর করে বাড়িভাড়া ব্যবসা ফেঁদে বসে আছে প্রায় তিন হাজার স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের শোষণ করে আদায় করে নিচ্ছে বাড়তি টাকা।

শ্রমিকদের অভিযোগ অস্বীকার করে বন্দরটিলা এলাকার ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ কলেজ এলাকার বাসিন্দা ও বাড়ির মালিক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘সব মালিক এক নয়। ভাড়া হয়তো কিছুটা বেড়েছে। তবে শ্রমিকরা যেভাবে বলছে সেভাবে বাড়েনি। আর বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ সবকিছুর দাম গত এক বছরে যেভাবে বেড়েছে তাতে ভাড়া না বাড়িয়েও মালিকদের কোনো উপায় থাকে না। ’ তিনি মনে করেন, তাঁরা ওই এলাকায় শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা না করলে সিইপিজেডও আজকের অবস্থানে আসতে পারত না।


মন্তব্য