kalerkantho

ওরা ‘স্বপ্নবাজ’ ১৮

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ওরা ‘স্বপ্নবাজ’ ১৮

নিজেদের জমানো টাকায় কেনা রিকশা তুলে দেওয়া হয় প্রতিবন্ধী মনছুরের হাতে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ ঘুনিয়া গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী মনছুর আলম (৪০)। কয়েকবছর আগে হঠাৎ দুই পা বেঁকে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। এর পরও প্রতিদিন ৫০ টাকা ভাড়ায় রিকশা চালিয়ে সংসারের ভরণ-পোষণ চালান মনছুর। বাড়িতে আছেন বাক প্রতিবন্ধী স্ত্রী গুলতাহার বেগম ও দুই মেয়ে। তাঁদের নিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে না খেয়ে চলছে দিন। বড় মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া বকেয়া নবম শ্রেণিতে পড়েছে। কিন্তু টাকার অভাবে ছোট মেয়ে তছলিমা জন্নাতের পড়ালেখা একেবারেই বন্ধ।

এই অবস্থায় মনছুরের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘ইয়ং চেঞ্জ মেকার’ নামে স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠন। তাঁকে একটি রিকশা কিনে দেওয়া ছাড়াও ছোট মেয়ের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার সব খরচের দায়িত্ব নিয়েছে সংগঠনটি। ‘একটি পরিবর্তনকামী মন পুরো দেশ বদলে দিতে পারে’ স্লোগানে কাজ করছে সংগঠনটি। এই সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের ‘স্বপ্নবাজ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।

সংগঠনটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৮। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২০ বছর। তারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

ইয়ং চেঞ্জ মেকারের অন্যতম উদ্যোক্তা ও মুখপাত্র আততিহারুল কবির তিহার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ বেকার। আমাদের উদ্দেশ্য, শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম একজন ব্যক্তিকে উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়া। তাই প্রথমবারের মতো বেছে নিয়েছি শারীরিক প্রতিবন্ধী মনছুর আলমকে। ’

তিনি জানান, ‘স্বপ্নবাজদের’ মাসিক ১০০ টাকা চাঁদা থেকে জমানো টাকায় প্রথমবারের মতো ১৭ হাজার টাকায় একটি রিকশা কিনে প্রতিবন্ধী মনছুরকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর ছোট মেয়ের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার যাবতীয় খরচ বহন করা হবে। আর যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছে একটি মোবাইল সেট।

তিহার বলেন, ‘তবে এই রিকশার বিপরীতে মনছুরের সঙ্গে শর্তযুক্ত চুক্তি হয়েছে। প্রতিদিন ৫০ টাকা করে সংগঠনের কাছে ফেরত দিতে হবে তাঁকে। বছরের ৪০ সপ্তাহ পর্যন্ত এই টাকা ফেরত দেওয়ার পর ওই রিকশার পুরোপুরি মালিক হবেন মনছুর। ’

মনছুর আলম আবেগাপ্লুত এই সহায়তা পেয়ে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিজে প্রতিবন্ধী মানুষ, এই অবস্থায় বাক প্রতিবন্ধী স্ত্রী ও দুই কন্যার দুই বেলা ভাত জোগাড় করা আমার পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য। সেখানে একটাকা ছাড়া একটি রিকশা এবং ছোট মেয়ের পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়ায় আমাকে চিরঋণী করেছে এই সংগঠন। ’

চকরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী রনি সাহা বলেন, ‘যেকোনো আন্দোলন, সংগ্রাম, সমাজের কুসংস্কার দূরীকরণ, সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে যুগে যুগে যুবক-তরুণেরাই এগিয়ে এসেছে। এই সংগঠনের ছেলেরা পারবে সমাজকে বদলে দিতে। তারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা করে একবছর পার করার পর বর্ষপূর্তিতে একজন প্রতিবন্ধী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে তা নজিরবিহীন। ’

সংগঠনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট লুত্ফুল কবির বলেন, ‘তোমরা যারা এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মানবতার সেবা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছ, তা ভবিষ্যতে পাথেয় হয়ে থাকবে। তবে পড়ালেখার পাশাপাশি এই কাজ চালাতে হবে। ’

পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা আদনান রামীম বলেন, ‘ছেলেগুলোর চিন্তা-চেতনা অসাধারণ, অবাক করার মতো। তাদের রয়েছে অদম্য দেশপ্রেম। আমরাও তাদের পাশে থাকব সবসময়। এগিয়ে যাবে দেশ, এগিয়ে যাবে দেশের মানুষ। ’


মন্তব্য