kalerkantho

হাঁস এনেছে হাসি

ডিমের পাশাপাশি হাঁসেরও কদর বাড়ছে। খামারের লাল মুরগির মতো ডিম দেওয়া বয়সী হাঁসও বেশ বিক্রি হচ্ছে। প্রতিমাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার ডিম এবং ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার হাঁস বিক্রি করেন রফিক। বলেন, ‘খরচ শেষে মাসে আমার আয় হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।’

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হাঁস এনেছে হাসি

হাঁসপালনে সুদিন ফিরেছে রাঙ্গুনিয়ার রফিকের। ছবি : কালের কণ্ঠ

রফিকের সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। সংসারে স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে।

পরের জমিতে কৃষিকাজ করে কোনোমতেই এতগুলো মানুষের মুখের আহার জোগাতে পারছিলেন না তিনি। এর ওপর সন্তানদের লেখাপড়া আর পোশাক-আশাক।

প্রতিদিন সকালে পান্তাভাতে লবণ মেখে পেট শান্ত করে ছুটে যান ফসলের মাঠে। কখনো খরা, কখনো বন্যা বেঁচে থাকার মিনমিনে আলোটাও দপ্ করে নিভিয়ে দিত। অভাবে পড়ে বিক্রি করে দিলেন ঘরের গরু দুটিও। দুই চোখে নেমে আসে রাজ্যের অন্ধকার। দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগানও থেমে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সন্তানদের লেখাপড়া। বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল।

২০১৪ সালে রফিকের কষ্টের এমন দিনে এগিয়ে আসেন রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা গ্রামের করম আলীর ছেলে শামসু মিয়া। তিনিও জীবনযুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে হাঁসপালনে জড়িয়েছিলেন। রফিককেও স্বল্পপুঁজিতে হাঁসপালনে উদ্বুদ্ধ করেন শামসু। কিন্তু রফিকের হাতে তো টাকা নেই! শামসু তাঁকে ১২টি হাঁসের বাচ্চা ধার দেন। রফিক বাচ্চাগুলো নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের খাবার কোত্থেকে আসছে, তাঁরা কীভাবে চলছে, সেদিকে তাঁর কোনো নজর নেই। রফিকের স্ত্রী পরের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে পেটের জ্বালা মেটানোর চেষ্টায় আছেন। এদিকে, রফিকের ১২টি হাঁসের ছানা বছর না ঘুরতেই ২৫০টি হাঁস হয়ে যায়। এবার তিনি হাঁসের খামার গড়ার স্বপ্ন দেখেন। এবার এগিয়ে এলেন চন্দ্রঘোনা হাজিপাড়া গ্রামের সমাজসেবী মোহাম্মদ ফরিদ।

তিনি রফিককে হাঁস পালনের জন্যে বিনা টাকায় অনাবাদি বিস্তীর্ণ জমি ছেড়ে দেন। ধীরে ধীরে রফিকের জীবনভাগ্য বদলে যেতে থাকে। ফিরে আসতে থাকে পরিবারের সুখ। এখন তাঁর খামারে হাঁসের সংখ্যা ৪৫০টি।

রফিকুল আলমের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার রঘিনাথপুর গ্রামে। একই গ্রামের অন্য ধানকাটা শ্রমিকদের সাথে ১৯৮৬ সালে কাজের সন্ধানে রাঙ্গুনিয়া আসেন তিনি। আর ফিরে যাননি নিজ এলাকায়। এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করতে করতে এক সময় ওই গ্রামেই বসতি গড়ে তোলেন। বিয়ে করে সংসারী হয়ে যান।

রফিক জানান, একটি হাঁস একটানা তিন মাস ডিম দেয়। ৪৫০টি হাঁসের মধ্যে ৩০০ হাঁস পালাক্রমে প্রতিদিন ডিম দেয়। এই ডিম তিনি প্রথম প্রথম বাজারে বিক্রি করতেন। এখন ক্রেতারা বাড়ি এসে ডিম নিয়ে যান। এছাড়া এখন হাঁসের ডিমের পাশাপাশি হাঁসেরও কদর বাড়ছে। ফার্মের লাল মুরগির মতো ডিম দেওয়া বয়সী হাঁসও বেশ বিক্রি হচ্ছে।

প্রতিমাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকার ডিম এবং ১০-১৫ হাজার টাকার হাঁস বিক্রি করেন তিনি। বলেন, ‘খরচ গিয়ে মাসে আমার আয় হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ’

জানা গেছে, হাঁসের একদিনের বাচ্চা রংপুর আনেন রফিক। হাঁসের খাদ্য হিসেবে ধান ব্যবহার করেন। হাঁসগুলো সকালে ছেড়ে দেওয়ার পর স্থানীয় গুমাইবিলের জমিতে বিচরণ করে। বিলের জমি থেকে প্রাকৃতিক খাবার খুঁজে নেয় হাঁসগুলো।

এ সময় তাঁকে পাহারা দিতে হয়। হাঁস বিকেল হলেই খামারে চলে আসে।

রফিক বলেন, ‘অভাবের টানাটানির সংসারে যখন আমি নিঃস্ব, তখন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমি অনেকের কাছে সামান্য টাকার জন্য ধর্না দিই। শামসু আমাকে হাঁসপালনে উদ্বুদ্ধ করে ১২টি হাঁসের ছানা দিয়ে সাহায্য না করলে আর ফরিদ জমি না দিলে আমাকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে মরতে হত। আমি এই দুজনের কাছে আজীবনের জন্য ঋণী। ’

তিনি মনে করেন, সমাজে শামসু-রফিকের মতো মানুষ যত জন্ম হবে, ততই সমাজ দারিদ্র্যমুক্ত হবে। রফিক তাঁর হাঁসের খামারটিকে এক হাজার বাচ্চার খামারে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন। ‘এই হাঁস আমার জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছে। সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। হাঁসই ফিরিয়ে দিয়েছে জীবনের হাসি। ’ বলেন রফিক।


মন্তব্য