kalerkantho


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্বশান্তি প্যাগোডা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ দেখতে যান অনেক পর্যটক। ছবি : কালের কণ্ঠ

ইট বিছানো সড়কের দুপাশে আড্ডায় মত্ত একঝাঁক শিক্ষার্থী। হাসি-ঠাট্টায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলেও ঘরে ফেরার তাড়া নেই কারো।

সড়কের পাশে লাল ইটের কারুকার্যে নির্মিত ভবন দেখে প্রথমে যে কেউ ভুল করতে পারেন পার্বত্য অঞ্চলের কোনো মন্দির ভেবে! আসলে এটি মন্দির নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাস ও প্রার্থনাকেন্দ্র ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’।

প্যাগোডা কমপ্লেক্সের প্রবেশমুখে রয়েছে একটি প্রার্থনাঘর।

এখানে আছে ধ্যানরত বুদ্ধের সাত ফুট উঁচু মূর্তি। এর সামনে আছে সোমপুর বিহারের আদলে ইটের কারুকার্যে তৈরি পাঁচ স্তর সিঁড়ি বিশিষ্ট গোলাকার উঠোন। আর উঠোনের তিন দিক ঘিরে আছে ভিক্ষু ও গোবিন্দ গুণালংকার বৌদ্ধ ছাত্রাবাস। উঠোনের পূর্ব দিকে তাকালেই রাজপুকুরের ঘাট। ওই পুকুর ঘাটে তরুণ-তরুণীদের ‘সেলফিমেলা’ ও আড্ডা বসে। প্যাগোডার ডান পাশে প্রায় ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার যা থেকে পুরো ক্যাম্পাস দেখা যায়। প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী ছুটে আসেন সেখানে।

১৯৮২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বশান্তি প্যাগোডার কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রশিক্ষণ, ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা, মুদ্রণযন্ত্র, গ্রন্থাগার ও জাদুঘর সমৃদ্ধ করেছে এটিকে।

১৯৯৫ সালে ইতালির রেডক্রস সোসাইটির প্রতিনিধি ফাদার পিয়েট্টো রুইজি লুপি ছাত্রাবাসটি নির্মাণ করে দেন। ছাত্রাবাসের নিচতলার বাঁ দিকে বৌদ্ধ ধর্মগুরু পণ্ডিত জ্যোতিঃপাল মহাথেরর স্মৃতির সম্মানে রয়েছে জাদুঘর। এখানে রয়েছে তাঁর জীবন-ইতিহাস, সাহিত্যকর্ম এবং প্রাপ্ত পুরস্কার। আর ধর্মগ্রন্থ সম্ভারসহ বুদ্ধের মূর্তিতো রয়েছেই। পর্যায়ক্রমে ১৯৯৮ সালে ছাত্রাবাসের দ্বিতীয় ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দুই ভবনে ৮০ আসনে ১০০ ছাত্রের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁরা সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত জ্যোতিঃপাল মহাথেরর বিশাল কর্মময় জীবনের অমর কীর্তি। একটি ছাত্রাবাস, জাদুঘর ও বৌদ্ধমন্দির মিলে নাম হয়েছে ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’। জ্যোতিঃপাল মহাথের তাঁর বিশাল বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের শেষ ২০ বছর এখানে অতিবাহিত করেন।

শত শত ছাত্রছাত্রীর স্মৃতি রোমন্থনের প্রিয় জায়গা এই প্যাগোডার করিডোর! চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বনভোজনের জন্য বেছে নেয় প্যাগোডার নির্জন ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ।

প্যাগোডায় ঘুরতে আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত সুলতানা বলেন, ‘প্যাগোডার নান্দনিক পরিবেশ, স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী সবাইকে মুগ্ধ করে। তাই অবসরে সময় পেলেই বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরতে চলে আসি। ’

ছাত্রাবাসের শান্ত, নির্জন ও মনোরম পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ছাত্রহল থেকে আলাদা করে রেখেছে বিশ্ব শান্তি প্যাগোডাকে। নানান প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছ যোগ করেছে

নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে প্যাগোডায় থাকে উৎসবের আমেজ। অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় এসব অনুষ্ঠানে।

প্যাগোডার বাসিন্দা যীশু বড়ুয়া বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে আমি এখানে আছি। এখানে রাজনৈতিক কোনো কার্যকলাপ বা প্রভাব নেই। স্বাধীনভাবে

পড়াশোনা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রার্থনা করার একটি অন্যতম পবিত্র স্থান এটি। ’

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা এবং তত্সংলগ্ন ছাত্রাবাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়।

তবু এই প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। এখানকার প্রতিটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মনে করেন, ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশ্বশান্তি প্যাগোডার তত্ত্বাবধায়ক অলকেশ বড়ুয়া বলেন, ‘২০১১ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছি। পাহাড়ি ছাত্ররা এখানে তাদের নিজের মাতৃভাষায় কথা বলে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য নানা উৎসবের আয়োজন করে। ’

প্যাগোডার পরিচালক ড. জিনবোধি ভিক্ষু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে বিশ্বশান্তি প্যাগোডা ও গোবিন্দ-গুণালংকার বৌদ্ধ ছাত্রাবাস অন্যতম। এখানে নতুন কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হলে পর্যটকদের আরো আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। ’ প্যাগোডায় আবাসিক ছাত্রদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যার কারণে প্রতিটি ছাত্রকে রান্না করে খেতে হয়। এতে তাদের খাবারের খরচ বেশি হচ্ছে। আশা করছি বিষয়টি অতি তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব। ’


মন্তব্য