kalerkantho


শিবুর পেরা বিদেশেও যায়

রাউজান উপজেলার ফকিরহাটে একটি ঝুপড়ি ঘরে পাওয়া যায় বিশেষ স্বাদের এই মিষ্টি। ওই দোকানে প্রায়ই ভিড় জমে যায়। গরুর খাঁটি দুধ আর চিনি দিয়ে তৈরি হয় এসব পেরা

জাহেদুল আলম, রাউজান   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শিবুর পেরা বিদেশেও যায়

পেরা তৈরি করেন শিবুপদের ভাই আশীষপদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাউজানে গেছেন কিন্তু ‘শিবুর পেরা’ খাননি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। উপজেলার ফকিরহাটে একটি ঝুপড়ি ঘরে পাওয়া যায় বিশেষ স্বাদের ওই মিষ্টি। ওই দোকানে প্রায়ই ভিড় থাকে ক্রেতার। স্থানীয় প্রবাসীর মাধ্যমে বিদেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই পেরার চাহিদা রয়েছে বেশ।

উপজেলা সদরের পালিতপাড়ার কালীপদের ছেলে শিবুপদ। বছরখানেক আগে শিবু মারা গেছেন। পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে তাঁর ছোটভাই আশীষপদ হাল ধরেন ব্যবসার। একই গুণে মানে ওই পেরা তৈরি করেন তিনিও। সেখানে পেরার পাশাপাশি মাখন ও ঘি বিক্রি হয়।

আশীষ জানান, ১৯৮৬ সাল থেকে শিশু বয়সে তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে পেরা বানানোর কাজ শুরু করেন। ১৯৯২ সাথে রাউজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন।

এর পর পুরোদমে তাঁর বাপ-দাদার মিষ্টান্ন দ্রব্য তৈরির পেশায় যুক্ত। ওই স্থানে তাঁর জেঠা তেজেন্দ্র পদ অর্ধশত বছর আগে ব্যবসা শুরু করেন।

জেঠার হাত ধরে তাঁর বাবা কালীপদ পরবর্তীতে বড়ভাই শিবুপদ এই ব্যবসা পরিচালনা করেন। তবে শিবুর আমলেই পেরা বেশ খ্যাতি পায়। তাই এটি ‘শিবুর পেরা’ নামে বেশি পরিচিত।

আশীষ জানান, নিজের হাতেই দোহন করে নিয়ে আসা গরুর খাঁটি দুধ আর চিনি দিয়ে তৈরি হয় এসব পেরা। একটি পাত্রে দুধ আর চিনি মিশ্রণ করে চুলার আগুনে তাপ দিয়ে আঁঠালো করা হয়। এই আঠালো উপকরণ হতে তৈরি করা হয় সুস্বাদু পেরা। তিনি প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কেজি পেরা তৈরি ও বিক্রি করেন। প্রতিকেজি পেরার দাম ৩০০ টাকা। কেজিতে ৬০ থেকে ৬৫টি পেরা ধরে। খুচরার পাশাপাশি পাইকারিও বিক্রি হয়। খুচরা প্রতিটি পেরার দাম পাঁচ টাকা।

স্মৃতিহাতড়ে তিনি বলেন, ‘যখন আমি এসেছি ব্যবসায় তখন প্রতিকেজি পেরার দাম ছিল ৩০ টাকা। ’ জানা গেছে, তাঁর পেরা রাউজান ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মিষ্টির দোকানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় আগাম অর্ডার হয়ে যায়। অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। তবে পেরার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও পুঁজি, লোকবল ও সময়ের অভাবে তা পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে জানান আশীষপদ।

স্থানীয় লোকজন এবং পার্শ্ববর্তী দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিয়ে, পূজা-পার্বণসহ নানা অনুষ্ঠানে এই পেরার কদর সবচেয়ে বেশি। প্রায় সময় বিভিন্ন স্থান থেকে বেড়াতে আসা লোকজন ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে চাকরিরত অন্য জেলার লোকজন বাড়ি যাওয়ার সময় এই পেরা নিয়ে যান।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপসহ দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসীর স্বজনরা এখান থেকে পেরা নিয়ে বিদেশে পাঠান।

পেরা কিনতে এসেছিলেন মল্লিকা দে। তিনি বলেন, ‘স্বামী ওমানে থাকেন।

তিনি বলেন আশীষের পেরার কথা। তাই স্বামীর কাছে পাঠানোর জন্য পেরা কিনতে এসেছি। ’

দোকানের একমাত্র কর্মচারী নেত্রকোনার সুজিত জানান, পেরা ছাড়াও সেখানে মাখন আর ঘি তৈরি হয়।

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এখানকার মাখন খাওয়ার জন্য যুবক ও মধ্য বয়সীরা দোকানে আসেন। আশীষ কলাপাতা করে মাখন পরিবেশন করেন। প্রতিটি মাখনের জন্য ১০ টাকা করে নেন। দৈনিক এক কেজি মাখন বিক্রি হয় তাঁর। তিনি জানান, প্রতিকেজি মাখনের দাম ১৫০০ টাকা আর ঘিয়ের দাম ১৬০০ টাকা। পেরা তৈরির পর অবশিষ্ট দুধ দিয়ে মাখন আর ঘি তৈরি করেন বলে জানান আশীষ।

পেরা বিক্রি করে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সুখেই চলছে আশীষের সংসার। তবে তাঁর আশঙ্কা, পুঁজি ও লোকবলের অভাবে এক পর্যায়ে হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে তাঁর দোকান। এ ব্যাপারে তিনি সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করেন।

 


মন্তব্য