kalerkantho


রেংমিত্চ্যরা কি হারিয়ে যাবেন!

দেশে ১৮ বছর আগে রেংমিত্চ্য ভাষায় কথা বলেন এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ২২ জন। দুই বছর আগে পাওয়া গেল ১২ জন। এখন ওই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে আটজনে। তাঁরা হলেন আলীকদমের পায়া ম্রো, মাংপুন ম্রো, টিংওয়াই ম্রো, কাইংপা ম্রো, রেংপুন হেডম্যান, কুনরাও ম্রো, কোলেং ম্রো ও কুনরাও ম্রো (৩)।

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রেংমিত্চ্যরা কি হারিয়ে যাবেন!

রেংমিত্চ্য ভাষায় কথা বলেন আলীকদমের মেনপুং ম্রো ও থোয়াইংলক ম্রো। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে ১৮ বছর আগে রেংমিত্চ্য ভাষায় কথা বলেন এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ২২ জন। দুই বছর আগে পাওয়া গেল ১২ জন।

এখন ওই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে আটজনে। তাঁরা হলেন পায়া ম্রো, মাংপুন ম্রো, টিংওয়াই ম্রো, কাইংপা ম্রো, রেংপুন হেডম্যান, কুনরাও ম্রো, কোলেং ম্রো ও কুনরাও ম্রো (৩)। বান্দরবানের আলীকদমে গভীর অরণ্যে তাঁদের বসবাস। এদের কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হলে রেংমিত্চ্য ভাষার তথ্য দিতে পারেন এমন লোকও হারিয়ে যাবেন। হারিয়ে যাবে রেংমিত্চ্য ভাষাও!

রেংমিত্চ্য ভাষা নিয়ে গবেষণা করেন মার্কিন নাগরিক ডেভিড পিটারসন। তাঁর দেওয়া তথ্যে জানা গেছে এসব তথ্য।

জানা গেছে, রেংমিত্চ্য ভাষা সম্পর্কিত তথ্য প্রথম পাওয়া যায় জার্মানির লেখক লোফলার-এর ‘দ্য ম্রো’ গ্রন্থে। লোফলার তাঁর বইতে ‘রেংমিত্চ্য’ ভাষাভাষী মানুষের কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন। এই ভাষা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুঁজে বের করেন আমেরিকান নাগরিক ডেভিড পিটারসন।

১৯৯৯ সালে থেকে তাঁর রেংমিত্চ্য ভাষা সন্ধানের শুরু। টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলো ঘুরে বিলুপ্তপ্রায় এই ভাষা বলতে পারেন এমন কয়েকজনকে নিয়ে এসে বান্দরবান প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে রেংমিত্চ্য পুনরুদ্ধারের কাহিনি জানান। এর পরই নড়েচড়ে বসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তারাও রেংমিত্চ্য ভাষা নিয়ে কাজ শুরু করে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানভিত্তিক সমীক্ষাতেও রেংমিত্চ্য ভাষার তথ্য পাওয়া যায়।  

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্যভাণ্ডারে বাংলা ভাষা ছাড়া বাংলাদেশে আরো ২৫টি ভাষার তথ্য ছিল। টানা তিন বছর বৈজ্ঞানিক মেথড ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা গবেষণা ইন্সটিটিউট খুঁজে পেয়েছে আরো ১৫টি মাতৃভাষা। এ অবস্থায় সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে মাতৃভাষার সংখ্যা ৪১টি। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় চাকমা, মারমা, ককবরক (ত্রিপুরা), ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, খুমি, লুসাই, পাংখোয়া ও চাক ছাড়াও রেংমিত্চ্য, রাখাইন, অহমিয়া এবং নেপালি ভাষাভাষিরা বসবাস করেন। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারীদের একটি অংশ সাঁওতাল, গারো বা মান্দি, হাজং, কোচ, মাহলে, কোল, কোদা, মন্দারি, খারিয়া, সাউরা, খাসি, কুরুথ, মালটো, তেলেগু, লালেং বা পাত্রা, মণিপুরী-বিষ্ণুপ্রিয়া, মণিপুরী-মেইথেই, লিঙ্গম, সাদ্রি, মাদ্রাজি, থর, উর্দু, উড়িয়া, কানপুরী ও কান্দো ভাষায় কথা বলা মানুষ বসবাস করে।

এতদিন মনে করা হত, রেংমিত্চ্য একটি স্বতন্ত্র ভাষা হলেও এই ভাষাভাষিরা আলাদা কোনো জাতিসত্তা নয়। ম্রো জনজাতির একটি অংশ বা বিশেষ একটি অঞ্চলের মানুষের কথ্য ভাষা রেংমিত্চ্য। লোফলার তার ‘দ্য ম্রো’ গ্রন্থে ‘রেংমিত্চ্য’কে বিলুপ্তপ্রায় একটি ভাষা উল্লেখ করে বলেন, ‘ম্রো জনজাতির মানুষদের একটি বড় অংশ এই ভাষায় কথা বলেন। ’ ডেভিড পিটারসনের বর্ণনাতেও এমনটিই ওঠে আসে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রেংমিত্চ্য শুধু একটি ভাষা, নাকি এই ভাষায় কথা বলতেন স্বতন্ত্র একটি জাতিসত্তা-এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক সিং ইয়ং ম্রো। তিনি দাবি করেন, রেংমিত্চ্য শুধু একটি ভাষা তা এখনো ‘সর্বসম্মত মীমাংসিত কোনো তথ্য’ নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের রেকর্ডে চূড়ান্তভাবে লিপিবদ্ধ করার আগে এ বিষয়ে আরো গবেষণার আহবান জানান সিং ইয়ং ম্রো। তিনি জানান, রেংমিত্চ্য জাতির মানুষরাই এক সময় রেংমিত্চ্য ভাষায় কথা বলতেন। নিজেদের জনসংখ্যা কম থাকা এবং বৈবাহিক সূত্রে কালক্রমে ম্রোদের সাথে মিশে যাওয়ায় গবেষকরা ভুল করেই এমনটি বলছেন।

সিং ইয়ং ম্রো জানান, বম ও ম্রো জনজাতির মতোই রেংমিত্চ্য জাতিদেরও একই গোত্রের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ। এ অবস্থায় জনসংখ্যা কম থাকার কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে রেংমিত্চ্য ছেলের জন্যে ম্রো বা খুমি মেয়ে এবং রেংমিত্চ্য মেয়েকে বিয়ে দিতে হত ম্রো বা খুমি ছেলের সাথে। এরূপ প্রক্রিয়ার কারণে রেংমিত্চ্য ভাষাভাষি মানুষের সংখ্যা আরো কমতে থাকে।

আলীকদম উপজেলার তৈন মৌজায় ৪০টি রেংমিত্চ্য পরিবার ছিল। অন্য জাতির সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক হতে হতে এখন ১০টি পরিবারও নেই। একসময় এরাও অন্য জাতির সাথে মিশে গেলে ‘রেংমিত্চ্য’ জাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তিনি দাবি করেন, একসময় তাঁরাও নিজেদের ‘রেংমিত্চ্য’ পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, শুধু জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে তাঁরা রেংমিত্চ্য নাম ভুলে নিজেদের ম্রো হিসেবেই মেনে নিচ্ছে। সিং ইয়ং ম্রোর তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারের আরাকান রাজ্যে ৮০ হাজারের মতো রেংমিত্চ্য জাতিসত্তার মানুষ আছেন। তাঁদের অবস্থাও প্রায় একই। বিপন্ন অবস্থার কারণে তাঁরাও সেখানে নিজেদের ‘ম্রো-খুমি’ নামে পরিচয় দিচ্ছেন।

সিং ইয়ং বলেন, ‘অবস্থাটা কত নাজুক হয়ে এসেছে যে, তৈন মৌজার হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) রেনপুং ম্রো অস্তিত্ব সংকটের কারণে এখন বলছেন ‘রেংমিত্চ্য ভাষায় কথা বললেও আসলে আমরা ম্রো জাতি। ’ 

অবশ্য তাঁর এই তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন ‘ম্রো স্যোশাল কাউন্সিল’ এর চেয়ারম্যান রাং লাই ম্রো এবং থানচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খামলাই ম্রো। তাঁরা বলেন, লিখিত রূপ না থাকলেও ম্রোদের মধ্যে বেশ কয়েকটি কথ্যভাষা প্রচলিত ছিল এবং আছেও। রেংমিত্চ্য এমনই একটি উপভাষা বা ম্রো ভাষার একটি অন্যতম কথ্যরূপ।

রাংলাই ম্রো বলেন, ‘ম্রোরা দমরং, তামছা, সাংমা, দওপ্রেং, রেংমিত্চ্য, মুরুংচ্য এসব আঞ্চলিক/উপভাষায় কথা বলেন। অন্য এলাকাতেও রেংমিত্চ্য ভাষার মানুষ থাকলেও আলীকদমে উপজেলার তৈন খালের আশেপাশের দুর্গম এলাকাগুলোতে বসবাসকারীরাই মূলত রেংমিত্চ্য ভাষায় কথা বলেন।

তবে আশার কথা শুনিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইয়াং ঙান ম্রো। তিনি ডেভিড পিটারসনের সাথে কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। তিনি বলেন, ‘ডেভিড সবসময় আশঙ্কা করতেন-চর্চা না বাড়ানো গেলে এখন যারা বেঁচে আছেন, বয়সের ভারে তাঁরা মরে  গেলে রেংমিত্চ্য ভাষা পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। ’

ইয়াং ঙান জানান, ডেভিড পিটারসনের পরামর্শে অতি সম্প্রতি তিনি এবং আরো কয়েকজনের উদ্যোগে ‘রেংমিত্চ্য ভাষারক্ষা কমিটি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে গিয়ে মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে রেংমিত্চ্য ভাষাভাষীদের বোঝানো হবে এই কমিটির কাজ। ভাষারক্ষা কমিটির সদস্যরা চেষ্টা করবেন- যেন রেংমিত্চ্য ভাষাভাষিরা নিজেদের মধ্যে ‘রেংমিত্চ্য’ ভাষায় কথা বলেন এবং রেংমিত্চ্য ঐতিহ্যকে ধরে রাখেন।

তিনি আরো জানান, এ ধরনের প্রচারের ফলে তাঁরা নাকি এখন আগের চেয়ে নিজেদের ভাষায় ভালোভাবেই কথা বলতে পারেন। একে অপরের সাথে গ্রামে বা হাট-বাজারে দেখা হলেই তারা রেংমিত্চ্য ভাষা দিয়ে কথা বলেন।


মন্তব্য