kalerkantho

সম্ভাবনা

সৈকতে শৈবাল চাষ

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সৈকতে শৈবাল চাষ

কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছড়া সমুদ্রসৈকতে পরীক্ষামূলকভাবে শৈবালচাষ শুরু হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারের সাগরতীরে পরীক্ষামূলক চলছে সামুদ্রিক শ্যাওলা বা শৈবালচাষ। শহরের উত্তর নুনিয়াছড়ার মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী নদীর মোহনার চরে শৈবালচাষ করা হচ্ছে।

শৈবাল মানুষের খাবার ছাড়াও ওষুধ, অয়েন্টমেন্ট, ক্রিম, দাঁতের মাজন, চকলেট, আইসক্রিম, ডিসটেম্পার পেইন্ট, লিপস্টিক ও নারীদের মেকআপসহ আরো অনেক কাজে ব্যবহার হয়।

এদিকে শৈবালচাষ প্রসারে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) যৌথভাবে কয়েকটি কর্মশালাও করেছে। এতে কৃষিবিদ ও কৃষি বিভাগের কর্মীসহ স্থানীয়দের কাছে শৈবাল চাষাবাদ পদ্ধতি ও বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

কৃষিবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলেছেন, দেশের ৭১০ বর্গ কিলোমিটারের সামুদ্রিক উপকূলীয় এলাকায় শৈবালচাষ হবে কৃষিক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শৈবালচাষ হচ্ছে বিভিন্ন দেশেও।

বেশ উন্নতমানের শৈবাল ব্যাপক বাজারও পেয়েছে কানাডা ও ফিলিপাইনে। এসব দেশে শৈবালকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে স্যুপসহ নানা খাবার তৈরি হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শৈবালচাষ জনপ্রিয় করতে সরকার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ‘বাংলাদেশে সিউইড চাষ’ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় দেশের সাগরতীরবর্তী এলাকায় শৈবালচাষের জন্য হাতে নিয়েছে ‘সিউইড চাষ’ প্রকল্প।

গত বছরের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। আগামী জুনে শেষ হবে প্রকল্পের মেয়াদ।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোসতাক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিউইড চাষ প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় টেকনাফের নাফ নদে। গত বছরের জানুয়ারিতে নাফ নদে পরীক্ষামূলক শৈবালচাষ করে দেখা যায়, সেখানে পানির লবণাক্ততা তুলনামূলক কম। এছাড়া নাফ নদের পানির কারণে শৈবালে এক ধরনের আবরণ পড়ে যায়। এসব কারণে শৈবালচাষের পরীক্ষামূলক স্থান পরিবর্তন করা হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে শুরু করা হয় কক্সবাজার বিমানবন্দরের উত্তর পাশে নুনিয়াছড়া সৈকতে। ’

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. মোসতাক জানান, সাগর উপকূলে পাওয়া শৈবাল নিয়ে বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথা জনসাধারণকে জানানো এবং খাবার হিসেবে ব্যবহার ও চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা।

সরেজমিন দেখা যায়, উত্তর নুনিয়াছড়া সৈকতের একটি নির্দিষ্ট স্থানে লম্বা রশি দিয়ে শৈবালচাষ করা হচ্ছে। রশিতে শৈবালের অংশ বিশেষ আটকিয়ে সাগরের তীরের চরে ফেলে রাখা হয়।

জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত পানিতে দ্রুত বেড়ে যায় শৈবাল। মাত্র দুই সপ্তাহে এগুলো আহরণ করা হয়ে থাকে। চরের অনেক বড় জায়গাজুড়ে রশি দিয়ে চাষ করা হচ্ছে শৈবাল। এতে বেশ ভালো ফলনও দেখা যাচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।

ওই চরে দীর্ঘদিন ধরে শৈবাল আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় মোহাম্মদ করিম।

তিনি বলেন, ‘সাগরের চমৎকার একটি উদ্ভিদখাদ্য শৈবাল। ৬/৭ বছর ধরে এগুলো আহরণ করে আমি জীবন চালাচ্ছি। ’ তিনি জানান, ওই দিন সকালে তিনি মাত্র দুই ঘণ্টায় ১৭ বস্তা শৈবাল আহরণ করেন। তিনি বান্দরবানের বাজারে বিক্রির জন্য পাঠিয়েছেন ১৮৫ কেজি শৈবাল।

এগুলোর বেশ চাহিদা আছে সেখানে। পাহাড়ি লোকজন এগুলোর গ্রাহক।

করিম আরো জানান, তিনি সাগর তীর থেকে শৈবাল আহরণের পর রোদে শুকিয়ে নেন। এর পর বস্তাভর্তি করে পাঠান বান্দরবানে। পাইকারি প্রতিকেজি বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।

আর বান্দরবানে বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। তাঁর দাবি, কৃষি বিভাগ তাঁকে দেখেই নুনিয়াছড়ায় পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছে।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মালা রাখাইন তিথি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই এখান থেকে সংগ্রহ করে থাকি শৈবাল। এগুলো চাটনি করে ভাতের সাথে খেয়ে থাকি। ’

আরেক রাখাইন ছাত্রী উমাচিং বলেন, ‘পুষ্টিতে ভরপুর এসব শৈবাল। অনেকে জানেন না এগুলো এক প্রকার খাবার। তবে আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে শৈবালের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ’

রাখাইন গৃহবধূ শামা জানান, শৈবাল ভালো করে ধুয়ে কাঁচা মরিচ দিয়ে চাটনি করলে মজাদার খাবার হয়।

সিউইড চাষ প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজ। তিনি জানান, শৈবালের কোনো মূল ও ফুল নেই।

সাগরের পানি থেকে শরীরের সমস্ত অংশ দিয়ে পুষ্টি গ্রহণ করে এরা বৃদ্ধি পায়।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও ইনানীসহ কক্সবাজার সৈকতে প্রচুর শৈবাল পাওয়া যায়। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ গাছেও কিছু শৈবাল জন্মায়। তিনি বলেন, ‘শৈবালে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন আছে।

এসব ভিটামিনের মধ্যে বিটা ক্যারোটিন, বি-গ্রুপের ভিটামিন, ভিটামিন সি ডি ই ও কে রয়েছে। সেই সাথে ওষধি গুণও রয়েছে। ’

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এই দ্বীপে প্রচুর পরিমাণ শৈবাল পাওয়া যেত। দ্বীপের অনেক লোক এগুলো আহরণ করে জীবনধারণ করত। দ্বীপের পাথরে জন্মাত এসব। শৈবালগুলো পাশের দেশ মিয়ানমারে বিক্রি করা হত। কিন্তু ইদানীং দ্বীপে মিলছে কম। ’

প্রকল্পের পরামর্শক অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজ জানান, শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীন, জাপান ও কোরিয়ায় শৈবালচাষ হচ্ছে। ফিলিপাইনের প্রায় ১০ লাখ মানুষ শৈবালচাষের ওপর নির্ভরশীল। ভারতও ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করেছে শৈবালচাষ। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামুদ্রিক শৈবালচাষের মূল্যমান ৬০৮ হাজার কোটি টাকার অধিক। ’


মন্তব্য