kalerkantho


যানজট সড়কে, যাত্রী কমছে আকাশে

আসিফ সিদ্দিকী   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



যানজট সড়কে, যাত্রী কমছে আকাশে

সড়কে তীব্র যানজটের প্রভাব পড়েছে আকাশপথে। যাত্রী কমে গেছে বিমানে। সাম্প্রতিককালে এমনটি প্রায়ই ঘটছে চট্টগ্রাম-ঢাকা আকাশপথে।

ওই পথে ২০১৬ সালে সাড়ে চার লাখ বিমানযাত্রী আসা-যাওয়া করেন। যা এর আগের বছরের তুলনায় ২০ হাজার জন বেশি। তবে সংখ্যায় বেশি হলেও যাত্রী বাড়ার হার কমেছে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম-ঢাকা আকাশপথে যাত্রী বাড়ার হার সাড়ে চার শতাংশ। এর আগের বছর ছিল সাড়ে ১২ শতাংশ আর ২০১৪ সালে ১০ শতাংশ।

দেশের চারটি বিমান সংস্থা বাংলাদেশ বিমান, রিজেন্ট এয়ার, ইউএস বাংলা ও নভোএয়ার ওই আকাশপথে যাত্রী পরিবহন করছে। এক বছরে ফ্লাইট বেড়েছে। প্রতিযোগিতার কারণে ভাড়াও বছরজুড়ে কম ছিল।

এর পরও যাত্রী বাড়ার হার কমেছে।

চট্টগ্রাম-ঢাকা চার লেন সড়ক চালু এবং নতুন একটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু হওয়ায় অনেক কম সময়ে যাত্রীরা ঢাকায় আসা-যাওয়া করছেন। এর বিপরীতে শহর থেকে একজন যাত্রী চট্টগ্রাম বিমানবন্দর পৌঁছতে এবং ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মূল ঢাকা শহরে যেতে ব্যাপক যানজটের কবলে পড়েন। এসব কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আকাশপথে যাত্রী কমেছে বলে মনে করেন বিমানবন্দর ব্যবহারকারীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার রিয়াজুল কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে যাত্রী প্রবৃদ্ধি বেশি না হওয়ার অন্যতম কারণ যানজট। নগরীর যেকোনো প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর পৌঁছতে প্রচুর সময় লাগায় যাত্রীরা নির্ধারিত ফ্লাইট ধরতে পারেন না। এতে যাত্রীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। ’

সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ৪ লাখ ৫৭ হাজার বিমানযাত্রী আসা-যাওয়া করেছেন। এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩৭ হাজার। ২০১৬ সালে যাত্রী বেড়েছে ২০ হাজার, প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে চার শতাংশ। ২০১৫ সালে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১২ শতাংশ। ২০১৪ সালে যাত্রী ৩ লাখ ৮৮ হাজার, প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। ২০১৩ সালে ৩ লাখ ৫৩ হাজার এবং ২০১২ সালে ৩ লাখ ১২ হাজার জন।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পৌঁছতে ছোট বিমানের ক্ষেত্রে ৩০ মিনিট আর বড় বিমানে সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট সময় লাগে। সেই ৪০ মিনিট ভ্রমণের ভাড়া সর্বনিম্ন ৩২০০ টাকা। শুধু বিমানবন্দর আসা-যাওয়ায় বাড়তি তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় হয় যাত্রীদের।

ওই রুটে নিয়মিত বিমানযাত্রী জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চিটাগাং কসমোপলিটনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এলিট সময় বাঁচাতে ইদানীং সড়কপথ ব্যবহার করছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সময় বাঁচাতেই বিমানে ভ্রমণ করে ঢাকায় যাই। কিন্তু ৩০ মিনিট যাত্রার জন্য আমাকে নগরীর জিইসি মোড় থেকে যেতে দুই ঘণ্টা সময় হাতে রাখতে হয়। একইসাথে ঢাকা বিমানবন্দর থেকেও দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে ঢাকার মূল শহরে পৌঁছতে হয়। আগে বিমানবন্দরে ঢোকা, লাগেজ নেওয়া মিলিয়ে পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়। আর সড়কপথে গেলে সাড়ে চার ঘণ্টা লাগে সুতরাং সময় সাশ্রয়ের জন্য কিছু যাত্রী সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন। ’

তাঁর পরামর্শ, চট্টগ্রাম ও ঢাকা মূল শহরের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ যেমন ওভারপাস, আন্ডারপাস অথবা ট্রেন সার্ভিস নিশ্চিত করলে শতভাগ সুফল মিলবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মূল শহর থেকে বিমানবন্দরের দূরত্ব ২১ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে রয়েছে কেবল একটি সড়ক। এই সড়কে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর, দেশের সবচেয়ে বড় চট্টগ্রাম ইপিজেড। বিকল্প সড়ক না থাকায় এই কম দূরত্ব পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় সড়কে, বিশেষ করে ইপিজেড গেটে।

চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে শহরে যান তখন ইপিজেড মোড়েই তাঁর ঘণ্টা পার হয়ে যায়, এটা খুবই বিব্রতকর। কারণ তাঁর সফরের ওপর কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ নির্ভর করে। ’

তিনি পরামর্শ দেন, নৌবাহিনী ঘাঁটির ভিতর দিয়ে সড়কটি হালকা যানবাহনের জন্য খুলে দিয়ে একইসাথে ডক শ্রমিক কলোনির ভিতর দিয়ে সড়কটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা গেলে ইপিজেডকেন্দ্রিক যানজট ৫০ শতাংশ কমে যাবে।

এদিকে, বিমানযাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সাময়িক সমাধান হিসেবে সল্টগোলা থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত সড়কের একপাশে পৃথক লেন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গত বছরের ২৩ অক্টোবর। কিন্তু সেটি কার্যকর করেনি চট্টগ্রাম নগর পুলিশ  কিংবা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

এর সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে পুলিশের বন্দর জোনের উপকমিশনার আবু সায়েম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। এই রুটে ফুটপাতে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠেছে। সেগুলো উচ্ছেদ করলে কার্যকর করা সম্ভব। সেটি বাস্তবায়ন আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। ’

স্থায়ী সমস্যা সমাধানে বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে সল্টগোলা পর্যন্ত ফ্লাইওভার বা উড়াল সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্প প্রি-একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রি-একনেক থেকে একনেকে অনুমোদন হয়ে সেটি বাস্তবায়ন হতে আরো দুই বছর সময় লাগবে।

 


মন্তব্য