kalerkantho


কেঁচোসারে স্বাবলম্বী

সামসুল হাসান মীরন, নোয়াখালী   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কেঁচোসারে স্বাবলম্বী

কেঁচোসার উৎপাদন করে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের অনেক নারীর দিন ফিরেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সীমিত খরচ, পরিবেশবান্ধব এবং বিক্রির সুবিধা থাকায় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে কেঁচোসার উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ছে নারীদের। স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার প্রণোদনায় গত দুই বছরে উপজেলার দুই সহস্রাধিক নারী কেঁচোসার উৎপাদনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। সরকারি বা বেসরকারিভাবে বড় পরিসরে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা পেলে কেঁচোসার দিয়েই ফসল উৎপাদন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমে আসবে।

সরেজমিনে সুবর্ণচর উপজেলার পশ্চিম চরবাটা ও পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ বাড়িঘরে নারীরা বাড়ির আঙিনায় স্বল্প পরিসরে কেঁচোসার উৎপাদনে ব্যস্ত। দুটি রিং স্নাইডের মধ্যে ২ হাজার অস্ট্রেলিয়ান লাল কেঁচো আর ১০০ কেজির মতো কাঁচা গোবর দিয়ে চাষ শুরু হয়। এভাবে প্রতি ১৫ দিন পর পর কাঁচা গোবর প্রক্রিয়া করে স্নাইডে দেওয়া হয়। আর ওই স্নাইড থেকে ১৫ দিনে ২৫ কেজি করে কেঁচোসার উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত সার কৃষক নিজেদের আঙিনায় লাগানো সব রবি ফসলে ব্যবহার করেন। একই সাথে ধান, সয়াবিন, চিনা বাদাম, মরিচ, তরমুজসহ সকল ক্ষেত্রে জৈবসার হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। এছাড়া অনেক কৃষক নিজেদের উৎপাদিত কেঁচোসার আশপাশের কৃষকের কাছে বিক্রিও করেন।

এছাড়া যেসব এনজিও কেঁচোসার উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ দেয় তারাও কেঁচোসার কিনে নেয়। এতে একদিকে কৃষক বিষমুক্ত শষ্য উৎপাদন করছেন, অপরদিকে কেঁচোসার বিক্রি করে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন। অল্প খরচে ও সহজে সার উৎপাদন করতে পারায় দিন দিন কেঁচোসার উৎপাদনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষক উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। সুবর্ণচর উপজেলার পশ্চিম চরবাটা গ্রামের রহিমা বেগম জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্থানীয় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে এক হাজার কেঁচো ও একটি রিং স্নাইডে বসিয়ে এবং সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি কেঁচোসার উৎপাদন শুরু করে। ইতোমধ্যে তিনি স্থানীয় আরো পাঁচজনের কাছে প্রতি হাজার কেঁচো ৫০০ টাকা করে পাঁচ হাজার কেঁচো বিক্রি করেছেন। এর পরও বর্তমানে তাঁর কাছে ৭-৮ হাজার কেঁচো রয়েছে। একই সাথে সম্প্রতি স্থানীয় ৫০ নারীকে কেঁচোসার উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করে নিজেই প্রশিক্ষণও দিয়েছেন তিনি।

চলতি বছর তিনি ও তাঁর স্বামী নিজেদের আবাদি তরমুজ ক্ষেতে শুধু কেঁচোসার ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, কেঁচোসার ব্যবহার করায় অন্যদের তুলনায় এবার ভালো তরমুজ উৎপাদন করেছেন তাঁরা। যা সম্পূর্ণ বিষমুক্ত।

মজিদ গ্রামের নিলুফা আক্তার জানান, তিনি কেঁচোসার উৎপাদন করে সেগুলো বাড়ির আঙিনায় লাগানো সিম, বরবটি, পুঁই শাকসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেতে ব্যবহার করেন। এতে অন্যদের তুলনায় ভালো সবজি উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছেন এই কৃষাণি।

বেসরকারি একটি হিসাবে দেখা যায়, সুবর্ণচর উপজেলায় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ও এসডিআই নামক এনজিও কেঁচোসার উৎপাদনে কৃষকদের সাথে কাজ করছে। বর্তমানে উপজেলার সব কয়টি ইউনিয়নে কেঁচোসার উৎপাদন ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চরবাটা ইউনিয়নের পূর্ব চরবাটা, চরবাটা, হাজীপুর, নোয়াপাড়া, উত্তরচর মজিদ, চরমহিউদ্দিন ইউনিয়নের দক্ষিণ চর মজিদ, চরবাগ্গা ও চর মহিউদ্দিন অন্যতম। এসব গ্রামে দুই সহস্রাধিক নারী কেঁচোসার উৎপাদনে যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা নিজেদের আঙিনায় সবজিচাষে ব্যবহার করেন এসব সার। পাশাপশি বিক্রিও করেন। চলতি রবি মৌসুমে তরমুজ চাষেও পরীক্ষামূলকভাবে অনেক কৃষক কেঁচোসার ব্যবহার করে সুফল পেয়েছেন।

কৃষক জানান, সরকারি বা বেসরকারিভাবে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা পেলে প্রত্যেকটি কৃষকপরিবার কেঁচোসার উৎপাদন করবে। এতে রাসায়নিক সার ব্যবহার থেকে সরে আসবেন তাঁরা। সকল ফসলের ক্ষেত্রে প্রতিকানি (দেড় একর) জমিতে ৮০০ কেজি কেঁচোসার যথেষ্ট। আর ওই পরিমাণ সার উৎপাদন করা সহজ এবং সম্ভবও।

তাঁদের মতে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে বড় পরিসরে নারীর পাশাপাশি কৃষকদের অবহিতকরণ কর্মশালার মাধ্যমে কেঁচোসারের উপকারিতা সম্পর্কে জানানো যেতে পারে। এছাড়া বিনা সুদে ঋণ, কেঁচো, প্রয়োজনীয় উপকরণসহ প্রশিক্ষণ দিলে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনে কেঁচোসার কৃষিবিপ্লব ঘটাতে পারে।

সাগরিক সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রুহুল মতিন জানান, সুবর্ণচর উপজেলায় ২০১৩ সালের নভেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম কেঁচোসার উৎপাদন শুরু করে সংগঠনটি। পরবর্তীতে সংস্থার বিভিন্ন উপকারভোগী ৩০ গ্রাহকের মাঝে স্বল্পমূল্যে কেঁচো সরবরাহ এবং একইসাথে সার উৎপাদনে প্রশিক্ষণও দেয়। তবে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া অধিকাংশ নারী। বর্তমানে সাগরিকার মাধ্যমে কেঁচোসার উৎপাদনে নারীদের মধ্যে ১৫০০ জনই তাদের প্রশিক্ষিত। বর্তমানে তারা বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ, স্নাইড ও কেঁচো বীজ প্রশিক্ষণার্থীদের দিচ্ছেন। আর প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্যদের উদ্ধুদ্ধ করছে।

একই সংস্থার পরিচালক (কৃষি) সাইফুল ইসলাম সুমন জানান, কেঁচোসারে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় ১৬টি উপাদন থাকে। এর মধ্যে মুখ্য খাদ্য উপাদান ৯টি ও গৌণ খাদ্য উপাদান ৭টি। ফলে এ সার ব্যবহারে মাটির অনুজৈবিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। আর মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা, ক্যাটায়ন ও এ্যানায়ন কার্যকারিতা বাড়ে। এছাড়া এই সার সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। কেঁচোসার ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত খাদ্যশস্য মানুষের শরীরের কোনো ক্ষতি করে না।

সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘২০০৫-০৬ সালে বিভিন্ন স্থানে সরকার কৃষকদের কেঁচোসার উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রকল্প নেয়। পরবর্তীতে ন্যাড প্রকল্পের মাধ্যমে কেঁচোসার উৎপাদনে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সুবর্ণচরে নারীরা রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে আনতে এর উৎপাদন করছেন। যা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। ’

তিনি জানান, কেঁচোসার বিষমুক্ত। এটি জৈবসারের মতোই কাজ করে। জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাত্রা কমিয়ে আনতে হলে কৃষকদের কেঁচোসার উৎপাদনে এগিয়ে আসতে হবে।

সুবর্ণচরে কেঁচোসার উৎপাদনে নারীদের বিভিন্ন এনজিও প্রণোদনা দিচ্ছে। একই সাথে সরকারের কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ ও মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য