kalerkantho


চাকমা ভাষার বর্ণমালা শেখা

শিক্ষকরাও শিক্ষার্থী!

জাকির হোসেন, দীঘিনালা   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষকরাও শিক্ষার্থী!

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় বর্ণমালার পাঠ্যবই হাতে পেয়ে খুশি শিশুরা। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষকের নিজস্ব মাতৃভাষার বর্ণমালার ধারণা না থাকায় বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে পাঠদানে।

তবে এমন পরিস্থিতিতে বিনা পারিশ্রমিকে চাকমা ভাষার বর্ণমালা শিক্ষা দিতে এগিয়ে এসেছে চাকমা সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করে এমন তিনটি সংগঠন। যাঁরা ইতোমধ্যে বর্ণমালা শিক্ষা দেওয়া শুরু করেছেন কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মাতৃভাষার বর্ণমালা শিক্ষায় শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয় নানা বয়সি নারী-পুরুষ এমনকি বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বর্ণমালা শিখছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, নিজেরা বর্ণমালা না চিনলে শিক্ষার্থীদের কীভাবে পাঠ্যবই থেকে শিখাবেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচালক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাক্মা ভাষার পাঠ্যবই লেখার লেখকসদস্য আনন্দমোহন চাকমা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় পাঠ্যবই সরবরাহ করায় আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে অনেক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ চাকমা শিক্ষকেরই চাক্মা ভাষার বর্ণমালার ধারণা নেই। সেই চিন্তা থেকে বর্ণমালা শিক্ষার কোর্স চালু করা হয়েছে। ’

দীঘিনালার বাবুছড়া ফ্রেন্ডশিপ স্কুল।

এটি মূলত একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল। বিদ্যালয়টিতে খোলা হয়েছে চাক্মা বর্ণমালা শিক্ষাকোর্স। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সেখানে চাকমা বর্ণমালা শিক্ষাকোর্স শুরু চালু হয়। দেখা গেছে, প্রথম দিনই কোর্সে অংশ নিয়েছে শ খানেক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কালেজ শিক্ষার্থীর সাথে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ ছাড়াও শিক্ষকও রয়েছেন। কথা হয় চন্দ্রমোহন কার্বারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রীনা চাকমার সাথে। তিনি বলেন, ‘সরকার প্রদত্ত ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর পাঠ্যবই তাঁর বিদ্যালয়ে পৌঁছেছে। কিন্তু নিজেদেরই চাকমা বর্ণমালার ধারণা নেই।   তো শিক্ষার্থীদের কি শিখাব। তাই এখানে ভর্তি হয়েছি। ’ মাতৃভাষার বর্ণমালা নিয়ে প্রথম দিন শিক্ষার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ‘নিজের ভাষার অক্ষর নিজেই চিনতাম না। এখন মাস্টারি জীবনে এসে শিখছি ভালোই লাগছে। ’

তাঁর পাশাপাশি বসে নিজের ভাষার বর্ণমালা শিখছিলেন দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী কণিকা চাকমা। তিনি বলেন, ‘কলেজ অবধি লেখাপড়া করেও নিজের ভাষার বর্ণমালার সাথে পরিচিত হইনি এতদিন। মাতৃভাষায় পড়ালেখাটা শেখার জন্য এখানে ভর্তি হয়েছি। ’

একই অভিব্যক্তি জানালেন বর্ণমালা শিখতে আসা স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও। বয়স্কদের সাথে বর্ণমালা শিখছিল উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী এলটন চাকমা ও ধ্রুব চাকমা। তাদের ভাষায়, ‘উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়লেও সেখানেতো চাকমা বর্ণমালা শেখানো হচ্ছে না। তাই অক্ষরজ্ঞানের মাধ্যমে এখান থেকেই শুরু করলাম। ’ চাকমা ভাষার বর্ণমালা শিক্ষা কোর্সে বর্ণমালা শিখছেন বাবুছড়া ফ্রেন্ডশিপ স্কুলশিক্ষক শ্রেয়সী চাকমা ও অমর রতন চাকমা। অমর রতন চাকমা জানান, নিজের ভাষার বর্ণমালা সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকলেও দীর্ঘদিনের চর্চার অভাবে ভুলতে বসেছেন তিনি। যা বুঝতে পারলেন সরকার প্রদত্ত পাঠ্যবই হাতে পেয়ে। তাই শিশুদের শেখানোর দায়িত্ববোধের কারণে নিজেই আগে শিখে নিচ্ছেন।

শিক্ষাকোর্স চালু করা হয়েছে মূলত সাঙু পাঠাগার, চাঙমা সাহিত্য বা এবং চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর উদ্যোগে। ‘সাঙু পাঠাগার’ সভাপতি ও ‘চাঙমা সাহিত্য বা’ এর সদস্য সচিব ইনজেব চাঙমা চারু জানান, বাবুছড়া ফ্রেন্ডশিপ স্কুলে চাক্মা বর্ণমালা শিক্ষা কোর্সের শিক্ষক হিসেবে তিনি এবং তাঁর সাথে রয়েছেন এলিয়েন্স চাক্মা। এ স্কুল ছাড়াও আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একইভাবে চাকমা বর্ণমালা শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে। ফ্রেন্ডশিপে প্রথম দিন পাঠ নিতে ৯৯ জন অংশ নিয়েছে। নতুন করে ভর্তির জন্য আরো অনেকে ফরম সংগ্রহ করেছেন।

নিজেদের সংগঠনের নামের বিশ্লেষণ দিয়ে ইনজেব জানান, সাঙু পাঠাগারকে চাক্মা সম্প্রদায়ের অনেকে ভুল করে সাঙ্গু পাঠাগার বলে। অথচ সাঙ্গু হলো একটি নদীর নাম আর সাঙু অর্থ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত মাচাং ঘরের মাচাং এ উঠার কাঠের সিঁড়ি। আর ‘চাঙমা সাহিত্য বা’ ‘বা’ অর্থ বাসা, আশ্রয়স্থল বা কেন্দ্র।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বরাত দিয়ে তিনি আরো জানান, এবার দেওয়া হয়েছে শিশু শ্রেণি বা প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের। আগামী বছর প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এবং এভাবেই পর্যায়ক্রমে উপরের শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পাবে।

আনন্দমোহন চাক্মা আরো জানান, মাতৃভাষার পাঠ্যবই হাতে পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর ভুলত্রুটি ও ব্যবহৃত ছবি নিয়ে কিছু সমালোচনা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে বই লেখায় কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি হতে পারে। তাই সমালোচনাও গুরুত্বের সাথে নেওয়া হচ্ছে। গঠনমূলক সমালোচনা সামনে শোধরানোর কাজে লাগবে।

 


মন্তব্য