kalerkantho


সাফল্য

পাহাড়ের বুকে কুমিরচাষ

ভিড় বাড়ছে পর্যটকদের

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পাহাড়ের বুকে কুমিরচাষ

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে কুমিরের খামার। ছবি : কালের কণ্ঠ

পাহাড়ের বুকে কুমিরচাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে পাহাড়বেষ্টিত এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ওই প্রকল্প। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি পর্যটকদের জন্যও দর্শনীয় স্থানে রূপ নিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমিরচাষ প্রকল্প এটি। গত নয় বছরে ৬০০টি বাচ্চা প্রজনন হয়েছে এখানে। প্রকল্প থেকে আগামী ডিসেম্বরে জাপানে রপ্তানি করা হবে ৩০০ কুমির। উদ্যোক্তারা আশা করছেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কুমিরচাষ বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা সদর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে এ প্রকল্পের অবস্থান। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বালুখালী টেলিভিশন উপকেন্দ্র থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার পূর্বে ঘুমধুম পাহাড়ি এলাকায় ২৫ একর জমির ওপর প্রকল্পটির অবস্থান। দেশের অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আকিজ ওয়ার্ল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সংসদ সদস্য শেখ আকিল উদ্দিন প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছেন।

প্রকল্পের স্থানীয় পরামর্শক ও সমন্বয়কারী ঝুলন দে কালের কণ্ঠকে জানান, ২০০৮ সালে ২৫ একর জমি কিনে সেখানে কুমিরচাষ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

আমদানি করা হয় মালয়েশিয়া থেকে ৫০টি কুমিরের বাচ্চা। ঘুমধুমের পাহাড়ে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শুরু করা হয় কুমিরচাষ। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া থেকে আনা তিনটি কুমির মারা যায়। অপর ৪৭টির মধ্যে ৩১টি মাদি কুমির বাচ্চা দেওয়া শুরু করে। মালয়েশিয়া থেকে আনার সময় এসব কুমির ছিল ৪/৫ ফুট লম্বা। বর্তমানে কুমিরগুলো ১৪/১৫ ফুট হয়েছে। ইতোমধ্যে  প্রায় ৬০০ কুমিরের বাচ্চার প্রজনন হয়েছে। নিবিড় পরিচর্যা, চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত খাবার প্রয়োগ করায় বর্তমানে সকল বাচ্চা সুস্থ রয়েছে।

প্রকল্পের সমন্বয়কারী আরো জানান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে কুমিরের মাংসের ব্যাপক চাহিদা আছে। আগামীতে ওই প্রকল্পে উৎপাদিত কুমির বিদেশে রপ্তানি করে হাজার কোটি টাকা আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে।

উদ্যোক্তারা আশা করছেন, কুমিরচাষের পাশাপাশি ওই প্রকল্পে প্রজাপতির চাষ, বার্ড পার্কসহ কটেজ ও মিউজিয়াম হাউস গড়ে তুলে প্রকল্পকে একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে দুই কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে বানর, হরিণসহ আরো অনেক প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র গড়ে তোলা হবে। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটলে সরকার পর্যটনখাতেও প্রচুর রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে।

কুমিরচাষ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম জানান, সপ্তাহে এসব কুমিরের খাবার হিসাবে ২০০ কেজি মাছ, ৩০০ কেজি মাংস সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি বাচ্চা কুমিরদের মাছ-মাংসের কিমা বানিয়ে খাওয়াতে হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিমাসে এসব কুমিরের জন্য ব্যয় হয় দেড় লাখ টাকা। ৩১টি মাদি কুমিরের দেওয়া ডিম থেকে গত ২ বছরে কমপক্ষে ৮০০ বাচ্চা ফোটানো হয়। মাদি কুমিরগুলোর প্রতিটি একবারে ৪০/৮০টি পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। ’

জানা গেছে, বিদেশে কুমিরের প্রতিকেজি মাংসের দাম ২৫/২৬ ডলার। চামড়া ও দাঁতের চাহিদাও কম নয়। চামড়া দিয়ে ব্যাগ এবং দাঁত দিয়ে নানা অলঙ্কার তৈরি করা হয়। কোরিয়ায় রপ্তানি করা হবে কুমিরের মাংস, জাপানে রপ্তানি করা হবে চামড়া ও হাড়। অন্যান্য সামগ্রী যাবে চীনে। অন্যদিকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ও দর্শনার্থীর সমাগম হচ্ছে কুমিরচাষ প্রকল্পে।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘অবহেলিত একটি ইউনিয়নে কুমিরচাষ প্রকল্পের মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় এলাকার অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রকল্পটির আকার বড় হওয়ার সাথে সাথে কর্মসংস্থানও বাড়বে। ’

ঘুমধুম ইউনিয়নের স্থানীয় সংরক্ষিত নারী সদস্য খালেদা বেগম বলেন, ‘কুমির প্রকল্পটির কারণে এখানে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠেছে। পর্যটকের আনাগোনাও শুরু হয়েছে। মহাসড়ক থেকে প্রকল্প পর্যন্ত যাতায়াতের সড়ক উন্নত করা হলে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়বে। ’


মন্তব্য