kalerkantho


মুছার ‘নিখোঁজ’ রহস্যজট আদৌ খুলবে কি?

এস এম রানা   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মুছার ‘নিখোঁজ’ রহস্যজট আদৌ খুলবে কি?

সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন আসামি মুছা সিকদারের ‘নিখোঁজ রহস্য’ উন্মোচিত হয়নি নয় মাসেও। বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ মুছা সিকদারই অন্য খুনিদের ভাড়া করে মিতুকে হত্যা করেছে-তদন্তকারী কর্মকর্তার দীর্ঘ তদন্তের ফল এতোটুকুই।

শেষ পর্যন্ত মুছার ‘নিখোঁজ রহস্য’ উন্মোচন না করেই মিতু হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের বক্তব্যেও এমন আভাস পাওয়া গেছে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠে নগর পুলিশের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে এক ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি শহীদুল হক বলেন, ‘মুছাকে পাওয়া না গেলে তাকে পলাতক দেখিয়েই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। ’

এদিকে মিতু হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে কবে নাগাদ জমা দেওয়া হবে জানতে চাইলে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগপত্র দাখিল করতে আরো সময় লাগবে। মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি আছে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুছা সিকদারকে খুঁজছি। তাকে না পেলে খুনের ঘটনার অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে না। তাই খুনের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের স্বার্থেই মুছাকে প্রয়োজন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘মুছাকে ধরিয়ে দিলে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছেন নগর পুলিশ কমিশনার।

কিন্তু এখনো তাকে পাওয়া যায়নি। ’

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, আসামিদের স্বীকারোক্তির তথ্য অনুসারে মুছা সিকদার খুনিদের ভাড়া করেছেন। এ কারণে খুনের অন্যতম আসামি মুছা সিকদার। আর অস্ত্র সরবরাহকারী হলেন এহতেশামুল হক ভোলা। ওই খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত দুটি অস্ত্র, গুলি ও মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়েছে। ভোলার কাছে পাওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, ওই অস্ত্র দিয়েই মিতুকে গুলি করা হয়েছিল। আসামি রাশেদ ও নূরুন্নবী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন। সাকু ও শাহজাহান কারাগারে আছেন। মুছা ও কালু পলাতক।    

মূল আসামি মুছাকে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এখন মামলার বাদী, বাদীর স্বজন, নিহত মিতুর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ’

মুছার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, তাঁর স্বামীকে পুলিশ গত বছরের ২২ জুন আটক করেছে বন্দর থানা এলাকা থেকে। এরপর থেকে মুছার ‘খোঁজ’ নেই। আর মুছার খোঁজে পুলিশের পুরস্কার ঘোষণার বিষয়টি পুলিশের ‘সাজানো নাটক’ বলে মনে করেন তিনি।

মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করেছেন, মুছাকে পুলিশ আটক করেছিল গত বছরের ৫ জুন মিতু হত্যাকাণ্ডের ১৭ দিন পর। কিন্তু পুলিশ কখনো মুছাকে আটকের কথা স্বীকার করেনি। যদিও ওই অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যদের নামও পান্না সিকদার জানিয়েছিলেন।

পান্না আক্তারের এমন দাবির জবাবে নগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার দাবি করেন, ‘ফৌজদারি আইন অনুযায়ী যিনি অভিযোগ করেন, অভিযোগ প্রমাণের দায় তার। সেই হিসেবে পান্না আক্তারকেই তাঁর অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। ’ পুলিশ কমিশনার নিশ্চিত করেন, ‘পুলিশ মুছাকে আটক করেনি। ’

আবার নগর পুলিশের যেসব কর্মকর্তা অভিযান চালিয়ে মুছা সিকদারকে গ্রেপ্তার করেছিলেন বলে তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করছেন, সেসব কর্মকর্তাদের বিষয়েও নগর পুলিশ দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁকে উদ্ধারের যে চেষ্টা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেওয়ার কথা ছিল, সেটাও দেখা যায়নি মুছার ক্ষেত্রে।

মুছা সিকদারই মিতুকে হত্যার কারণ এবং নির্দেশদাতার সম্পর্কে জানেন বলে মন্তব্য করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ আসামিকে বাদ দিয়ে মিতু হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনিই। অভিযোগপত্র দাখিলের অনেক কাজ তিনি এগিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ হবে না শর্তে নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিতু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া দুই আসামি রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছে। অন্যজন মুছা সিকদার নিখোঁজ। তবে এই নিখোঁজ রহস্য উন্মোচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। ’

তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রামে এর আগেও এমন কিছু অপহরণ কিংবা গুমের ঘটনা আছে, সেগুলো দীর্ঘ কয়েক বছরেও উন্মোচিত হয়নি। মুছা সিকদারেরও সেই ধরনের কিছু হয়নি-এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। ’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, নগর পুলিশ কমিশনার কিংবা পুলিশের আইজিপি যতই বলুক পুলিশ মুছা সিকদারকে আটক করেনি, এটা মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার কোনোভাবেই বিশ্বাস করেন না। পান্নার দাবি, তাঁর চোখের সামনেই পুলিশ তাঁর স্বামীকে তুলে নিয়েছে। মুছার হদিস পুলিশ অবশ্যই জানে। তবে নগর পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, মিতু হত্যার রহস্য পর্দার আড়ালে উন্মোচন করেছে পুলিশ। সরাসরি জড়িত তিন খুনির দুজনের লাশ পড়েছে। অন্যজন মুছা জীবিত নাকি অন্য কিছু সেটা ‘রহস্যজনক’ থাকবে। মুছার ‘নিখোঁজ রহস্য’ উন্মোচিত হবে এটা আশা না করে অভিযোগপত্রে মুছার নামের পাশে ‘পলাতক’ লেখা থাকবে-এটা আশা করাই হয়তো শ্রেয়।


মন্তব্য