kalerkantho


নিজের ঘর নেই শহীদ সবুরের স্বজনদের

জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নিজের ঘর নেই শহীদ সবুরের স্বজনদের

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সবুরের পরিবার ভালো নেই। অভাব-অনটনে খেয়ে না খেয়ে কাটছে দিন। তাঁর স্ত্রী রশিদা খাতুনের ভাষায়, ‘আমি আর পারছি না। স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার পর থেকে জীবনযুদ্ধের ঘানি টানছি। দীর্ঘদিন ধরে শরীরের বাসা বেঁধেছে রোগ-বালাই। ভাতার টাকায় সংসার চলে না। মৃত্যুই কেবল আমাকে মুক্তি দিতে পারে। ’

সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নের পূর্ব কাঠগড়ে তাঁর বাড়ি। সবুর তৎকালীন আনসার কমান্ডার ছিলেন। একাত্তরের জুন মাসের কোনো একদিন হঠাৎ সবুর রশিদাকে জানালেন তিনি যুদ্ধে যাচ্ছেন। বলেন, ‘দেশ স্বাধীন করতে হবে।

বেঁচে থাকলে ফিরে আসব। যদি মরে যাই ক্ষমা করে দিও। তখন তুমি সবাইকে বলতে পারবে তোমার স্বামী দেশের জন্য বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে। ’ সত্যিই সত্যিই দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু ফিরলেন না সবুর। শহীদ হলেন দেশের জন্য।

রশিদা খাতুন বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু দিন আগে বিলাইছড়ি এলাকায় পাকিস্তানিদের গুলিতে আমার স্বামীসহ ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। ’

রশিদার জীবন কেটেছে সংগ্রামে। বিয়ের পর শুরু হয় শঙ্খনদীর ভাঙন থেকে বসতঘর রক্ষার যুদ্ধ। বলেন, ‘১৩ বছরের মধ্যে তিনবার ঘর বেঁধেছি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ঘর। পরে বাবার বাড়িতে ছোট্ট একটি জায়গায় ঘর বেঁধে আশ্রয় নিই। স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার কয়েকদিন পর পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে আমার ঘর পুড়ে দেয়। এরপর ছয় মাসের শিশুসহ তিন সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। কখনো পাহাড়ি এলাকায় কখনো আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে। স্বামীর সম্পদ বলতে অল্প যে ভিটেটুকু ছিল তাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ’

দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু রশিদার দুঃখ মোচন হয়নি। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। কাঁধে তুলে নেন সংসারের ঘানি। ছোট ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু ওই আয় দিয়ে সংসার চলছিল না। পরে মাঠে শ্রমিকের কাজও করেন। সারাদিন মাঠে কাজ করেন। দিনশেষে সেই রোজগার দিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন এবং লেখাপড়া শিখিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪-৫ বছর পর থেকে ৫০ টাকা করে ভাতা পেতাম। সাবেক এমএনএ আবু ছালেহ এবং সাবেক সংসদ সদস্য ডা. বি এম ফয়েজুর রহমান ওই ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ভাতার পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ১৫ হাজার টাকা হয়েছে। এখন বয়স     হয়ে গেছে। কাজ করতে পারি না, শরীরও অসুস্থ। ছোট মেয়ে দিলোয়ারা বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী ও স্বামী পরিত্যক্তা। মেয়ে ও নাতি-নাতনি আমার সাথে থাকে। ভাতার টাকা নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ’

রশিদা খাতুনের আক্ষেপ, ‘অনেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সরকারিভাবে জমি ও ঘর পেয়েছে। কিন্তু আমি কিছুই পাইনি। মাঠে কাজ করে উপার্জিত টাকা খরচ করে ছেলেকে এইচএসসি পাস করিয়েছি। তাকেও সরকারি কোনো চাকরি দিতে পারিনি। একটা চাকরির জন্য অনেক জায়গায় ধর্ণা দিয়েছি। কিন্তু ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। যেখানে দুবেলা পেট পুরে খাবার পাই না, সেখানে ছেলের চাকরির জন্য ঘুষ দেব কীভাবে! সরকারিভাবে বাড়ি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে এক ব্যক্তি পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন। খাসজমি বন্দোবস্তি করে দেওয়ার কথা বলে আরেকজন নিয়েছেন চার হাজার টাকা। কিন্তু এখনো সরকারি বাড়ি আর জমি কোনোটাই পাইনি। ’

তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তাঁর একবার দেখা হয়েছিল। তাঁকে কাগজের তৈরি একটি ফুল উপহার দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন তিনি তাঁকে ১০০ টাকা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘আপনার স্বামী মারা গেছে এটা না ভেবে কোথাও বেড়াতে গেছে এমনটা ভাবেন। মনকে শক্ত করে সন্তানদের মানুষ করুন। ’

প্রধানমন্ত্রীর কাছে রশিদা খাতুনের মাত্র চাওয়া-পাওয়া খুব বেশি না। ‘নিজের সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের সাথে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার জন্য একটি ঘর চাই। আর আমার স্বামীর নামে একটি সড়কের নামকরণ চাই। ’ তিনি জানান, সাতকানিয়ার বিওসির মোড় থেকে পূর্ব দিকের কাঠগড় আলমগীর সড়ক আগে তাঁর স্বামীর নামে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নামটি কেউ বাদ দিয়েছে। ’

এ প্রসঙ্গে সাতকানিয়া উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী পারভেজ সারোয়ার বলেন, ‘সড়কটির নামকরণ নিয়ে একটু বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সবুরের নামে ছিল সড়কটি। আবার স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেছেন, সড়কটি তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধা ফজল করিমের নামে ছিল। আমরা দুপক্ষকে বলেছি, মন্ত্রণালয় থেকে যে নামে যিনি পাস করিয়ে আনতে পারবেন, তাঁর নামেই সড়কটির নামকরণ হবে। ’

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্যাহ বলেন, ‘রশিদা খাতুন একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে ঘর বা খাসজমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কোনো আবেদন করেননি। এখন বিষয়টি আমাদের মাথায় থাকলো। ভবিষ্যতে সরকারিভাবে বাড়ি আসলে অথবা খাসজমি বরাদ্দ হলে তাঁর কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া বাড়ির বিষয়ে তিনি আবেদন করলে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিতে পারব। ’


মন্তব্য