kalerkantho


তাঁরা দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জানান দিচ্ছেন নিজেদের অবস্থান বড় দুই দলের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে মাত্র দুজন ছাড়া অন্যরা আগে নির্বাচন করেননি

আগেভাগেই নির্বাচনী দৌড়ঝাঁপ

নূপুর দেব   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ‘ভিআইপি’ আসনগুলোতে সক্রিয় হয়েছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির স্থানীয় নেতারা। দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন তাঁরা। তবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের স্ব স্ব এলাকায় বেশি দেখা যাচ্ছে।

দুই দলের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে মাত্র দুজন ছাড়া অন্যদের কেউ আগে সংসদ নির্বাচন করেননি। আগামী নির্বাচনে তাঁরা মনোনয়ন চাইবেন নিজ আসনে। এই লক্ষ্যে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জাসদের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীরাও নিজ এলাকায় দলের সাংগঠনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরো দৃঢ় করছেন। তাঁদের অনুসারী নেতাকর্মীরাও মাঠে কাজ করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

নগরীর চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বন্দর-পতেঙ্গায় বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। টানা দুবার দলের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হওয়া লতিফের আসনে বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন।

সুজনকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল ওই সংসদীয় এলাকায় প্রথমে মনোনয়ন দিয়েছিল। পরে তা পরিবর্তন করে হঠাৎ লতিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এই দুই নেতা মাঝে মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এর মধ্যে লতিফ সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং সুজন সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এদিকে, সুজন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি জাগ্রত ছাত্র যুব জনতা, বন্দর-পতেঙ্গায় যাত্রী কল্যাণ সংস্থা, বঙ্গবন্ধু বিশেষায়িত হাসপাতাল বাস্তবায়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এলাকায় কাজ করছেন।      লতিফও তাঁর এলাকায় বিভিন্ন সময় ভোগ্যপণ্য কম দামে বিক্রির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছেন। এই দুই নেতার পাশাপাশি একই সংসদীয় এলাকা থেকে মহানগর আওয়ামী লীগের আরেক সহসভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চুও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে খোরশেদ আলম সুজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। দলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে তুলে ধরছি। আমি সব সময় এলাকার মানুষের আপদে বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারবিরোধী বিভিন্ন যড়ষন্ত্র প্রতিহত করেছি। আগামী সংসদ নির্বাচনে আমি দল থেকে মনোনয়ন চাইব। এই লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। ’

নগরীর কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন নুরুল ইসলাম বিএসসি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনেও বিএসসিকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে জোটগত কারণে আওয়ামী লীগ ওই আসনে প্রার্থী দেয়নি। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত নুরুল ইসলাম বিএসসিকে গত বছর বৈদেশিক, প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনেও দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন নুরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন বলে জানা গেছে। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

এদিকে, বিএসসির আসনে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার চৌধুরী মহীবুল হাসান নওফেলও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে। গত কোরবানির ঈদের সময় এলাকায় জনসাধারণের কাছে দোয়া চেয়ে নওফেলের নামে পোস্টার লাগানো হয়েছিল। নওফেল দলের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও চট্টগ্রাম এলে এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের কাছাকাছি যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের এ দুই নেতার পাশাপাশি মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন। বর্তমানে সরকারবিরোধী কর্মসূচি পালনে বিএনপির অনেক নেতা মামলা-মোকদ্দমার কারণে মাঠে না থাকলেও ডা. শাহাদাত মাঠে রয়েছেন। এ আসন থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান এমপি হয়েছিলেন। এ দুজন বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। এদিকে, নির্বাচনকে সামনে রেখে নোমান গত শনিবার তাঁর সংসদীয় এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বাসভবনে বৈঠক করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

ব্যারিস্টার চৌধুরী মহীবুল হাসান নওফেল বলেন, ‘পোস্টার আমি দিইনি। শুনেছি এলাকার দলীয় নেতাকর্মীরা এসব পোস্টার সাঁটিয়েছেন। এখন নির্বাচন নিয়ে কিছু ভাবছি না। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচন নিয়ে কাজ করেছি। এখন দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কাজ করছি। যখন নির্বাচন আসবে তখন দল থেকে যাঁকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেওয়া হবে তাঁর পক্ষে আমরা সবাই কাজ করব। আমাদের লক্ষ্য একটাই- দলকে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী করে সরকার গঠন করা। ’

একই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে বিএনপি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমাকে কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসন থেকে নির্বাচন করতে বলা হয়েছিল কেন্দ্র থেকে। কিন্তু নির্বাচন না করে দলের এক নেতাকে সুযোগ করে দিয়েছিলাম। এর পর আমি মেয়র নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। পরে সেটিও করিনি। এখন আমার লক্ষ্য ও প্রস্তুতি চলছে আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে। আমি কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসন থেকে মনোনয়ন চাইব। ’

পাহাড়তলী-ডবলমুরিং সংসদীয় আসনে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. আফছারুল আমীন। ২০০৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য হয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী হন তিনি। এলাকায় তাঁর শক্ত অবস্থান রয়েছে। তিনিও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন। এছাড়া এ আসন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা থেকে পদত্যাগ করা ‘আওয়ামী ঘরানা’ হিসেবে পরিচিত সাবেক সিটি মেয়র এম মনজুর আলম নির্বাচন করতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর শিষ্য হিসেবেও পরিচিত। মহিউদ্দিনের সাথে ডা. আফছারুল আমীনের দূরত্ব রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম বলেন, ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমি ২০ বছর ধরে এলাকায় সমাজসেবামূলক কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচনের জন্য এখনো তেমন কিছু ভাবছি না। একবার মেয়র এবং এর আগে দীর্ঘদিন টানা কয়েকবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। সবসময় চেষ্টা করেছি আপদে-বিপদে মানুষের পাশে থাকার জন্য। এ লক্ষ্যে আমি কাজ করছি। ’

চান্দগাঁও-বোয়ালখালী আসনে জাসদের কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দিন খান বাদল টানা দুবার সংষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই আসন থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। মহাজোটের কারণে পরে ওই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয়নি। এই আসন থেকে ২০০৮ ও  ২০১৪ সালে বাদল জাসদ থেকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হয়েছেন। এদিকে, ছালাম নির্বাচন না করলেও গত প্রায় আট বছর ধরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। তিনি এবার নিজ এলাকা থেকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করতে মনোনয়ন চাইবেন। এ লক্ষ্যে তিনি এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও দলীয় কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন হাইকমান্ডের কাছে। বাদলও মনোনয়ন চাইবেন দল থেকে।

একই আসনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদও মনোনয়ন চাইবেন। এ কারণে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদানের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার বাড়ি বোয়ালখালী। আগামী সংসদ নির্বাচনে বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে নির্বাচন করতে চাই। সেখানে দীর্ঘদিন আমাদের দলের এমপি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ হতাশা রয়েছে। এতে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরাও চান আমি এবার এই আসন থেকে নির্বাচন করি। আশাকরি একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবদান বিবেচনা করে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। এই লক্ষ্যে কাজ করছি। ’


মন্তব্য