kalerkantho


আঁধার শেষে আলো কর্ণফুলীর ওপারে

আসিফ সিদ্দিকী   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আঁধার শেষে আলো কর্ণফুলীর ওপারে

এবার আলোকিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পার। ছবি : রবি শংকর

কর্ণফুলীর উত্তর পারের মতো দক্ষিণ পারও আলোকিত হচ্ছে। সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এতোদিনের সেই আঁধার কেটে যাচ্ছে। বিশেষ করে বদলে যাবে পশ্চিম পটিয়া ও আনোয়ারা।

কর্ণফুলী নদীর উত্তর পারে চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে নগর ও শিল্পকারখানা গড়ে ওঠলেও দক্ষিণ পার পশ্চিম পটিয়া ও আনোয়ারা অংশ ছিল অন্ধকারে। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় পিছিয়ে পড়ে দক্ষিণ পারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তবে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলীর নিচে টানেল নির্মাণ, আনোয়ারায় চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, কোরিয়ান ইপিজেড পুরোদমে কার্যক্রম শুরু এবং মিরসরাই থেকে আনোয়ারা-বাঁশখালী হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সমুদ্র উপকূলে মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর ফলে পশ্চিম পটিয়া ও আনোয়ারার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আলোকিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পাল্টে যাচ্ছে পুরো এলাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা) চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্ণফুলীর ওপারে পরিকল্পিত শিল্পায়নের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতেও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে থাকা অঞ্চল আমূল পাল্টে যাবে।

উদ্যোক্তারা জানান, আনোয়ারা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হয়ে ওঠার প্রধান বাধা ছিল সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কর্ণফুলীর নদীর নিচে টানেল চালু হলে একজন বিদেশি ক্রেতা চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই আনোয়ারায় পৌঁছতে পারবেন। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্য এই পার থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে জাহাজে তুলে রপ্তানি করা যাবে। আর আমদানি পণ্যবাহী জাহাজ জেটিতে ভিড়ে সরাসরি কারখানায় নেওয়া সম্ভব হবে। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন খরচ অনেক কমে আসবে।

এসব সুবিধা মাথায় রেখেই দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আনোয়ারায় কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে অনেক আগেই। বেসরকারি উদ্যোগে দেশে মোটরগাড়ি সংযোজন কারখানা চালু করছে পিএইচপি গ্রুপ। ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আনোয়ারা উপজেলায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে এই কারখানা নির্মাণ করা হবে। কারখানাটিতে বছরে ১ হাজার ২০০ মোটরগাড়ি সংযোজন ও বিপণনের লক্ষ্য নিয়ে মালয়েশিয়ার ‘প্রোটন’ ব্র্যান্ডের নতুন গাড়ি আনছে প্রতিষ্ঠানটি।

শিল্পপতি ও আনোয়ারার বাসিন্দা নুরুল কাইয়ুম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বসুন্ধরা, পিএইচপি, ইউনাইটেড গ্রুপসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরকারি সুবিধার নিশ্চিতের ওপর নির্ভর করে বড় বিনিয়োগের অপেক্ষায় আছে। সঠিক সময়ে কারখানা স্থাপনের সব পরিকল্পনা নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারলে পুরোটাই পাল্টে যাবে আনোয়ারা। পরিকল্পিত শিল্পায়ন হবে সেখানে। ’

জানা গেছে, কর্ণফুলীতে সাড়ে তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ওই টানেল হবে দেশের প্রথম   সুড়ঙ্গপথ। এটি নির্মাণে খরচ হবে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থায়ন করবে সরকার। ২০২০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে। এরই মধ্যে টানেলের নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কম্পানি। টানেলটির অবস্থান হবে নদীর তলদেশের ১২ থেকে ৩৬ মিটার গভীরে। চার লেনের এ টানেল হবে দুই টিউব বিশিষ্ট। টানেলে যাতায়াতের সুবিধার্থে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পারে নির্মিত হবে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এর মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার, বান্দরবান ও টেকনাফের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

টানেলটি চালু হলে আনোয়ারা ব্যস্ততম শিল্পাঞ্চল হয়ে ওঠবে মত দিয়ে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চিটাগাং কসমোপলিটনের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে সমন্বয় রেখে স্পেশাল ইকোনমিক জোনে গ্যাস-বিদ্যুৎ-কারখানা স্থাপনের অনুমতিসহ অন্যান্য সুবিধাগুলো ‘স্পেশাল কেয়ারের’ মাধামে দিতে হবে। তা না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। আর এই সুবিধাগুলো নিশ্চিত হলে আমরাও বিনিয়োগের অপেক্ষায় আছি। ’’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনোয়ারার গহিরা এলাকার ৭৭৪ একর জমিতে হচ্ছে চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক জোন। দুই হাজার ২৪০ কোটি টাকায় এটি নির্মাণ করবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি। অর্থনেতিক জোনের অবকাঠামো নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এরই মধ্যে ওই অর্থনৈতিক জোনের জন্য ২৯১ একর খাসজমির দলিল সম্পাদন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণশিল্প, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যসামগ্রী, ফার্নেস ও সিমেন্ট শিল্পকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এতে ৩৭১টি শিল্প-কারখানা থাকবে। এর মধ্যে ২৫০টিই দেশিয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বরাদ্দ থাকবে।

কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে অনেক আগেই মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রি করেছেন ভোগ্যপণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের কর্ণধার আবুল বাশার চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো মাথায় রেখেই আমরা আনোয়ারা এলাকায় কারখানা সম্প্রসারণের জন্য অনেক আগেই উদ্যোগ নিয়েছি কিন্তু কাঙ্ক্ষিত জমি মিলছে না। এরপরও থেমে নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো নির্মাণ করে দেয় তাহলে জমি সংকটের সুরাহা হবে। ’ তিনি জানান, কর্ণফুলীর দক্ষিণ পার ঘিরে গড়ে ওঠবে জেটি। সেই জেটিতে জাহাজগুলো ভিড়িয়ে সহজে অনেক কম খরচে পণ্য নিজেদের কারখানায় নিতে পারবেন কারখানা মালিকরা। পণ্য উৎপাদনের পর সরবরাহের জন্য টানেল দিয়ে মেরিন ড্রাইভ হয়ে সরাসরি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

চট্টগ্রাম-বন্দর পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে ম্যাজিক অর্থনীতির দেশ। যেভাবে বিদেশিরা বিনিয়োগের জন্য চট্টগ্রামকে বেছে নিচ্ছেন সেই চাহিদামতো জমি চট্টগ্রাম শহরে নেই, শিল্প কারখানা সম্প্রসারণের সুযোগ নেই। সেই অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কর্ণফুলীর ওপারকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ’ তাঁর মতে, টানেল নির্মিত হলে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পার এবং চট্টগ্রাম শহর ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে বিবেচিত হবে। উন্নত বিশ্বের আদলে ওই নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, কর্ণফুলীর পার ঘেঁষে আনোয়ারায় আগে থেকেই শিল্প কারখানা চালু আছে। সরকারি চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ও ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট এবং বহুজাতিক কাফকো সার কারখানা। গড়ে ওঠেছে সিমেন্ট কারখানা, ভোজ্যতেল রিফাইনারি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। নতুন প্রকল্প চালু হলে কর্মসংস্থানেও ব্যাপক গতি পাবে। অনেক আগে অনুমতি পেলেও ভূমি জটিলতার কারণে এতোদিন খুব একটা গতি পায়নি  আনোয়ারায় দুই হাজার ৪৯২ একর জায়গা ঘিরে গড়ে ওঠা কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড)। এ প্রসঙ্গে কেইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেগুলোর কারণে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পার দ্রুত শিল্পায়ন হবে। এছাড়া কর্ণফুলী নদী দুই ভাগে বিভক্ত করার কারণে কানেকটিভিটি একটা সমস্যা ছিল। কানেকটিভিটি বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আশা করছি ভূমি জটিলতা কেটে গেলে আমরাও দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব। ’


মন্তব্য