kalerkantho


পুলিশের বদলি লটারিতে!

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পুলিশের বদলি লটারিতে!

জেলা পুলিশে বদলি কার্যক্রমে চালু করা হয়েছে ‘লটারি পদ্ধতি’। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই পদ্ধতির কারণে কর্মস্থল বদলিতে আগের সেই অঘোষিত দরদামের কারবার নেই। নেই দৌঁড়ঝাঁপ-তদবিরও!

অপরদিকে, জেলা প্রশাসনেও ‘উেকাচ চিত্র’ বদলে গেছে। একখণ্ড জমির খতিয়ান সৃজনে ২০/২৫ লাখ টাকা দেওয়ার ঘটনা আর নেই এখন। নেই অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে অবৈধ লেনদেন।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশে অবস্থা এমনই ছিল যে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে পোস্টিং কিনে নিয়ে চলত সেই টাকা তুলে নেওয়ার ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা। ইয়াবা পাচারকারীদের সাথে মিলেমিশে পোস্টিং নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বস্তা বস্তা টাকা কামাই করেছেন টেকনাফ সীমান্ত থেকে। ’

তিনি জানান, কক্সবাজার গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে এক সময় ইয়াবা নিয়ে রমরমা লেনদেন ছিল। ফেনীতে ২৪ কোটি টাকার ইয়াবার চালান নিয়ে ধরা পড়েছিলেন ঢাকা পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত উপপরিদর্শক মাহফুজ। ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন আরো দুজন উপপরিদর্শক বেলাল ও আশিক। তাঁরা সবাই কর্মরত ছিলেন কক্সবাজারে।

জানা গেছে, ‘ইয়াবা কানেকশন’ নিয়ে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে উচ্চ পর্যায়ের একটি দল কক্সবাজারে তদন্তে এসেছিল। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আলাপের পর তাঁরাও নিশ্চিত হয়েছিলেন বিষয়টি।

এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান কক্সবাজারের নতুন পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন। সাম্প্রতিক সময়ে জেলা পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। বদলি হয়েছেন পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। যোগ দিয়েছেন পুলিশের সংস্কার বিষয়ের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করা পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আফরুজুল হক টুটুল গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে সবকিছুতে একদিনেই শতভাগ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা চলছে। একই পদের জন্য যখন একাধিক পুলিশ আগ্রহী হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা লটারির ব্যবস্থা চালু করেছি। ’ তাঁর মতে, এতে অন্তত ব্যাপক দুর্নীতি ঠেকানো সম্ভব হবে।

অপরদিকে, গত দুই বছর ধরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনে নাগরিক সেবায় ফিরেছে গতি। একসময় জেলা প্রশাসনের নাগরিক সেবা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ছিল। এমনও অভিযোগ ছিল একখণ্ড জমির একটি খতিয়ান সৃজনে ২০/২৫ লাখ টাকা দিতে হত।

এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে জমির পরিমাণ এবং মূল্য বিবেচনায় খতিয়ান সৃজনের জন্য টাকা আদায়ের অংকও নির্ধারণ করে দেওয়া হত। সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তি নিয়ে ছিল এন্তার অভিযোগ।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘জেলা প্রশাসনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে নাগরিকসেবায়। বাস্তবে কক্সবাজারের মানুষ দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাচ্ছে। সেই সাথে কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতি দূরীকরণের পদক্ষেপকেও আমরা স্বাগত জানাই। ’ সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের কক্সবাজার জেলা সভাপতি অধ্যাপক এম এ বারী বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা ও পুলিশ প্রশাসন দুর্নীতি-অনিয়মমুক্ত থাকলে চলমান হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন মেগাপ্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। ’

অভিযোগ ওঠেছিল, জেলা প্রশাসনে অবৈধ লেনদেন ছাড়া সরকারি অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া যেত না। এমনকি মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে দেশের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প জাইকার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানেও ঘটেছিল বড় ধরনের লোপাটের ঘটনা। প্রায় ২১ কোটি টাকা লোপাটে ওই সময়ের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও সরকারি কর্মকর্তাসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জানা গেছে, জাইকা প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের টাকা লোপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরই কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল হয়।

জেলা প্রশাসক হিসেবে মো. আলী হোসেন যোগদানের পরই দুর্নীতিগ্রস্ত নাগরিকসেবায় তিনি স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনেন। অধিগ্রহণ করা জমির টাকা নিতে আর কাউকে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায়ও ধর্না দিতে হয়নি। জেলা প্রশাসক সেই ক্ষতিপূরণের টাকা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার লোকজনের এলাকায় গিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা করেন।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘সেবা প্রত্যাশী জনগণকে সঠিকভাবে সেবা দেওয়াটাই আমার দায়িত্ব। এখানে আমি শুধু দায়িত্বটা পালনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ’


মন্তব্য