kalerkantho


ব্যাটারিরিকশা দিনে অলিগলিতে সন্ধ্যার পর মূল সড়কে

নূপুর দেব   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্যাটারিরিকশা দিনে অলিগলিতে সন্ধ্যার পর মূল সড়কে

দিনে নগরীর সব অলিগলি আর সন্ধ্যার পর মূল সড়কে অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। অহরহ দুর্ঘটনার কারণে সাধারণ যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের বাহন এসব রিকশার সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।

সড়কে চলাচলে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তবে পুলিশ মাঝে-মধ্যে অবৈধ বাহনটির বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও কয়েকদিন না যেতেই বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ ওঠেছে, থানা ও ট্রাফিক পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা বিভিন্ন সড়ক, উপ-সড়ক, অলিগলিতে নির্বিঘ্নে চলছে। বেপরোয়া গতির এই রিকশার ভাড়াও অস্বাভাবিক। যা প্যাডেলচালিত রিকশার কয়েক গুণ।

পুলিশের ‘ম্যানেজ’ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (যানবাহন) দেবদাস ভট্টাচার্য সোমবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিরিকশা আটক করা হচ্ছে। মনসুরাবাদ ডাম্পিং স্টেশনে হাজার হাজার আটককৃত গাড়ি পড়ে আছে। মামলাও  হচ্ছে।

ব্যাটারিরিকশা প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায় না। আর পুলিশের ম্যানেজ হওয়ার বিষয়টি গড়পড়তা অভিযোগ। ’

চট্টগ্রাম মহানগর প্যাডেলচালিত রিকশামালিক পরিষদের সভাপতি সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘এককথায় অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো চট্টগ্রাম মহানগরে চলছে থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে। ২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল উচ্চ আদালত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পর কিছুদিন এসব রিকশা চলাচল বন্ধ ছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর আবার চলাচল শুরু করে। এখন আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে গেছে এই রিকশার সংখ্যা। নগরে প্রায় ৩০ হাজার ব্যাটারিরিকশা চলাচল করছে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন সময় আমরা পুলিশকে এই রিকশা চলাচল বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। নগর পুলিশ কমিশনার সর্বশেষ গত ২৯ ডিসেম্বর চার উপ-কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন অবৈধ রিকশা চলাচল বন্ধ করার জন্য। এর পরের দুদিন (শুক্রবার ও শনিবার) রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল। রবিবার থেকে অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। আবারও চলছে রিকশাগুলো। আদালতের নির্দেশনা মানলে এবং পুলিশ প্রশাসন কঠোর হলে নিষিদ্ধ এই রিকশা চলাচল বন্ধ হতে সময় লাগবে না। ’

জানা যায়, ২০১৩ সালের শেষ দিকে কয়েকটি ব্যাটারিচালিত রিকশা নামে নগরীতে। ২০১৪ সালে হাজারখানেক রিকশা নেমেছিল। তখন এসব রিকশার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল্লায় ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের কারণে প্রশাসন কয়েকদিন অভিযান চালিয়েছিল। এর পরও ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় রিকশা বানিয়ে অবাধে সড়কে নামানো হচ্ছে। পুলিশের দলাদলির কারণে কৌশল হিসেবে দিনের বেলায় নগরীর অলি-গলি ও সন্ধ্যার পর মূল সড়কে চলছে এসব রিকশা। সবচেয়ে বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে নগরীর বাকলিয়া, বায়েজিদ, হালিশহর, কোতোয়ালী, আকবর শাহ, ইপিজেড ও পতেঙ্গা থানা এলাকায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের (যানবাহন) পরিদর্শক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা অবৈধ। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। করপোরেশন গত ৫ ফেব্রুয়ারি রিকশামালিক নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। শিগগিরই ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন। শুধু তাই নয়, আগামী ১ মার্চ থেকে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার পাশাপাশি প্যাডেলচালিত অনিবন্ধিত রিকশার বিরুদ্ধেও অভিযান শুরু হবে। ’

এদিকে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বন্ধ এবং প্যাডেলচালিত অনিবন্ধিত রিকশা চলাচল বিষয়ে গত রবিবার দুপুরে নগরভবনের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সাথে চট্টগ্রাম মহানগরী রিকশামালিক পরিষদ নেতৃবৃন্দের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় রিকশামালিক পরিষদ নেতারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে নগরীতে অবৈধভাবে চলাচলরত ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্যাডেলচালিত বৈধ রিকশা নিরূপণের দাবি জানান।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘নগরবাসীর নিরাপদ চলাচলের স্বার্থে যান ও পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আন্তরিক। এ লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ’ তিনি জানান, চট্টগ্রাম নগরীতে ব্যাটারিচালিত এবং নিবন্ধনবিহীন প্যাডেলচালিত কোনো রিকশা চলাচল করতে পারবে না। বেঁধে দেওয়া সময়ের পর নিবন্ধনবিহীন সব রিকশার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্যাডেলচালিত ৭০ হাজার রিকশা নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে ৫৩ হাজার ৭৪২টি রিকশা নিবন্ধিত হয়েছে। বাকি রিকশা নিবন্ধন দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্ত বহাল আছে। গত বছর পর্যন্ত প্যাডেলচালিত ৪০ হাজার ৬০৫টি রিকশা নবায়ন করেছে। বাকি রিকশাগুলো নবায়নের জন্য সময় বেঁধে দেওয়ার পরও নবায়ন করেনি। তিনি ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্যাডেলচালিত রিকশার নবায়ন কাজ সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট মালিকদের আহ্বান জানান। অন্যথায় এক মাস পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সকল অবৈধ রিকশা জব্দ করা হবে।

ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা দিনে মূল সড়কে গাড়ি চালাই না। মালিক আমাকে বলেছেন সন্ধ্যা ৭/৮টার পর মূল সড়কে চালালে কোনো সমস্যা নেই। পুলিশের সঙ্গে কথা বলা আছে। তাই আমি দিনে অলিগলিতে চালাই, রাতে মূল সড়কে উঠি। কোনো সমস্যা হয় না। ’

বাকলিয়া এলাকায় চালানো রিকশাচালক রফিক আহাম্মদ বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চালিয়ে মালিককে ৩৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয় প্রতিদিন। এছাড়া দুই ঘণ্টা ব্যাটারি চার্জ দিতে ১০০ টাকা খরচ হয়। দিনে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ করে আয় থাকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ’


মন্তব্য