kalerkantho


পুলিশের তল্লাশি বিড়ম্বনায় বাসযাত্রীরা

এস এম রানা   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পুলিশের তল্লাশি বিড়ম্বনায় বাসযাত্রীরা

নগরীর প্রবেশমুখে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার থেকে আসা বাসযাত্রীরা তল্লাশি বিড়ম্বনায় পড়ছেন। জেলা ও নগর পুলিশ আলাদাভাবে একাধিক তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে সেখানে। অপরাধী বিশেষ করে ইয়াবার খোঁজে তল্লাশি চালানো হয় ওই রুটে চলাচলকারী প্রায় গাড়িতে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে যাত্রীদের তল্লাশি। অনেক সময় ইয়াবা মিললেও বেশির ভাগ নিরীহ যাত্রীকে পড়তে হচ্ছে সীমাহীন হয়রানির মুখে। পটিয়ার বাদামতল, শাহ আমানত সেতুর উভয় পাশে সর্বাধিক হয়রানির শিকার হন বাসযাত্রীরা। তল্লাশি কাজে নিয়োজিত পুলিশ সদস্য ও তাঁদের কথিত সোর্সের আচরণে অতিষ্ঠ যাত্রী সাধারণ সবাই।

তল্লাশির সময় বাসযাত্রী হয়রানি ও বিড়ম্বনার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বন্দর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আরেফিন জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তল্লাশিকালে যাত্রীরা যাতে বিড়ম্বনায় না পড়েন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে তল্লাশি শেষ করা যায়, সেই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে বিড়ম্বনা কমে আসবে। ’

সরেজমিন দেখা যায়, শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাশে ২০ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টায় কক্সবাজার থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাসকে পুলিশ থামানোর সংকেত দেয় যখন গাড়িটি বিনা বাধায় তল্লাশি চৌকি অতিক্রম করে যাচ্ছিল। পুলিশের আকস্মিক সংকেত পেয়ে চালক গাড়ি থামান প্রায় ১০ গজ দূরে। দেখা গেছে, তল্লাশি চৌকির সামনে পাঁচ-সাতজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। সেখান থেকে গাড়িতে এলেন একজন সহকারী উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ। ওই কর্মকর্তার ইউনিফর্মে র‌্যাঙ্ক ব্যাজ দেখে পদবি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাঁর বুকে নামফলক নেই। তিনি গাড়িতে উঠতেই চালককে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন চৌকি থেকে সামান্য দূরে গিয়ে বাস থামানোর কারণে। কিন্তু পুলিশ যে সংকেত আগে থেকেই দেয়নি, সেটা নিয়ে চালক কিছুই বলার সাহস পেলেন না।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা গাড়িতে উঠে তল্লাশি শুরু করেন। প্রায় প্রত্যেক যাত্রীর নাম, কোথা থেকে আসছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, নগরীতে কোনো আত্মীয়ের কাছে যাচ্ছেন কি না, আত্মীয় হলে কী ধরনের আত্মীয় ইত্যকার প্রশ্নবাণে যাত্রীরা জর্জরিত। এতে সময়ক্ষেপণ হতে থাকে। আর যাত্রীরা বিরক্ত মুখে পুলিশ কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড দেখছিলেন। এমন সময় এক বৃদ্ধাসহ চার যাত্রীকে পাওয়া গেল, যাঁদের বাড়ি টেকনাফে। তখন পুলিশ কর্মকর্তা আরও সক্রিয় হলেন, নগরীতে কোথায় কার কাছে কেন যাচ্ছেন-এসব বিষয়ে জানতে। বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, নাতনির বিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছেন। পুলিশ কর্মকর্তা, এবার বৃদ্ধের ফোন থেকেই যে আত্মীয় বাড়িতে যাচ্ছেন সেই আত্মীয়ের কাছে ফোন দিতে বললেন বৃদ্ধকে। তিনিও পুলিশের কথা অনুযায়ী ফোন করে বলা শুরু করলেন, ‘...আমরা যে বিয়েতে আসছি, এটা পুলিশকে বল। ’

শুনেই চরম বিরক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তা। কড়া ভাষায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কথা বললেন কেন?’ বৃদ্ধের জবাব, ‘আপনি ফোন করতে বললেন না?’ শুনে আরও মেজাজ গরম পুলিশ কর্মকর্তার, ‘আমি ফোন করতে বলেছি, কথা বলতে বলিনি। ’ এবার মোবইল ফোন নিয়ে ওপর প্রান্তের লোকের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন পুলিশ নিজেই। এক গাদা প্রশ্ন করতে থাকলেন। আর যাত্রীদের চোখেমুখে বিরক্তি ভাবও বাড়ছিল।

ওই গাড়িতে থাকা কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদক ঘটনাটির বিষয়ে ফোন করলেন কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ  (ওসি) রফিকুল ইসলামকে। ওসি জানালেন, কয়েকদিন আগেই অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এ কারণে গাড়ি একটু ভালো করে তল্লাশি হচ্ছে। কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আরো গাড়ি তল্লাশি করতে হচ্ছে, তাই...। ’ অন্য গাড়ি এখন নেই এবং পুলিশ কর্মকর্তারা সড়কে দাঁড়িয়ে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছেন জানানোর পর তিনি বললেন, ‘বিষয়টি আমি দেখছি। ’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তল্লাশিতে বৃদ্ধের কাছে কিছু পাওয়া গেল না।

ওই গাড়ির যাত্রীদের একজন বিপ্লব দাশ জানালেন, প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ তল্লাশির নামে সাধারণ যাত্রীদের হয়রানি করে। একটি গাড়িকে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে তল্লাশি করে। এতে যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়।

মধ্যরাতে এমন তল্লাশির পর কর্ণফুলী সেতুর উত্তর পাড়ে এসে সেই একই বিড়ন্বনা। এবার তল্লাশি করতে বাসে উঠলেন বাকলিয়া থানা পুলিশের দুজন সদস্য। তাঁরাও পাঁচ-সাত মিনিট তল্লাশি চালালেন। কিন্তু কিছুই পেলেন না।

ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, অবৈধ মালামাল পাচার কিংবা মাদক পাচাররোধে পুলিশের তল্লাশি একটি আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় পুলিশ অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় নিয়ে এবং সোর্স দিয়ে তল্লাশি করে যাত্রীদের হয়রানি করলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না। এক্ষেত্রে দ্রুত তল্লাশি করে যাত্রীদের রেহাই দেওয়া জরুরি বলে নিরীহ যাত্রীরা মন্তব্য করেছেন।


মন্তব্য