kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

আলোর পথের দিশারী

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আলোর পথের দিশারী

কক্সবাজারে শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক কসরত। ছবি : কালের কণ্ঠ

জোছনা বেগমের বিয়ে হয় ১৪ বছর বয়সে। চার কন্যা ও দুই ছেলের সংসারের বোঝা কমাতেই বিধবা মা নুরুন্নাহার বিয়ে দেন জোছনাকে।

কিছুদিন না যেতেই স্বামী বেদার মিয়া পাড়ি দেন মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। স্বামী হারিয়ে বাবাহারা কিশোরী জোছনা এখন কোথায় যাবে-এই চিন্তায় অস্থির। শেষ পর্যন্ত তার স্থান হয় কক্সবাজার শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানে টানা নয় মাস জোছনা সেলাই প্রশিক্ষণ নেয়। অল্পদিনের মধ্যেই একজন দক্ষ সেলাইকর্মী হয়ে উঠে সে।

অন্ধকারের ঘোর অমানিশা কাটিয়ে জোছনা এখন আলোর পথের যাত্রী। তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে দেওয়া হয়েছে একটি সেলাই মেশিন। ঘরে বসে সেলাইকাজ করছে সে। আয়-রোজগারও হচ্ছে ভালোই। সংসারে উঁকি মারছে সুদিন।

জোছনা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেছে, ‘শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র আমাকে বাঁচার পথ দেখিয়েছে। ’

জোছনার মতো আরেক হতভাগা কিশোরের নাম আব্দুল্লাহ। জীবনের ১০টি বসন্ত পার করে এলেও বঞ্চিত ছিল শিক্ষার আলো থেকে। অভাবের তাড়নায় শৈশবে তাকে বেছে নিতে হয় হোটেল বয়ের কাজ। দিনে তিনবেলা খাবার আর মাসে ৫০০ টাকা বেতনে কাজ করত সে। কিন্তু সেই কাজ তার ভালো লাগত না। সমবয়সী শিশুদের স্কুলে যেতে দেখলে মন কেঁদে উঠত। সে চায় শিক্ষিত মানুষ হতে। মাত্র চার মাস আগেও যা ছিল তার কাছে দুঃস্বপ্ন।

আব্দুল্লাহ এখন স্কুলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে চিনে ফেলেছে বাংলা বর্ণমালা। নিয়ম মতো পড়ালেখা করে। আর স্বপ্ন দেখে একদিন বড় হয়ে সে স্যারদের মতো চাকরি করবে।

শুধু জোছনা আর আব্দুল্লাহ ওই আলোর পথের যাত্রী নয়। আরো হাজারো শিশু স্বপ্ন দেখছে সুন্দর আগামীর। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে পূর্ণিমার আলোর মতো কাজ করছে শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। ‘ঝুুঁকিপূর্ণ’ শিশুদের সুপথে আনার অংশ হিসেবে সরকারের গৃহীত প্রকল্পের অংশ হিসেবে কেন্দ্রটি এখন শিশুদের আশ্রয়স্থল।

জানা গেছে, দেশের সাত বিভাগীয় শহরে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে চালু করা হয় শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এতদিন বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় করত ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। ২০১৫ সালে ফরিদপুর, বরগুনা, কুষ্টিয়া ও কক্সবাজার জেলায় স্থাপন করা হয় প্রকল্প কার্যালয়। দেশের ১১ বিভাগীয় ও জেলা শহরে স্থাপিত এসব কেন্দ্রে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ শিশু রয়েছে। এখন আর বিশ্বব্যাংক নয়। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকেই জোগান দেওয়া হচ্ছে প্রকল্পের সব টাকা।

কক্সবাজার শহরের রুমালিয়ার ছড়া ও দক্ষিণ রুমালিয়ার ছড়া চেয়ারম্যানঘোনায় দুটি বাড়ি ভাড়া করে পরিচালনা করা হচ্ছে কেন্দ্রটি। একটিতে ছেলে এবং অপরটিতে মেয়েরা থাকে। এদের সংখ্যা বর্তমানে মেয়ে ১১১ জন এবং ছেলে ৯২। শিশুরা যাতে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত না হয় সেজন্য এখানে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক উভয় ধরনের শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে কিশোর-কিশোরীরা বর্তমানে শহরের দুটি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ছে। এছাড়া তাদের টেইলারিং, মোবাইল, রেডিও, টেলিভিশন মেরামত, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, বিউটিফিকেশন, সেলাই এবং পারিবারিক সবজি চাষের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এরপর সহায়তা করা হয় পুনর্বাসন ও একত্রীকরণে। ইতোমধ্যে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে সেলাই মেশিনের সাহায্যে তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। বহন করছে সংসারের খরচ।

শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-প্রকল্প পরিচালক জেসমিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের দুটি কেন্দ্রে ২২৪ ছেলে ও ১৬৩ মেয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে পুনর্বাসন/পুনরেকত্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় ফেরত পাঠানো হয়েছে ১৩৩ ছেলে ও ৫৫ মেয়েকে। বিভিন্ন কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৫০ ছেলে ও ৩০ জন মেয়েকে। ’

প্রশিক্ষণ পরবর্তী ফলোআপের মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে যাওয়া শিশুদের পরিচর্যা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য