kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেদের আক্ষেপ

‘চুপকথা’ আর লেখা হবে না এই জীবনে

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘চুপকথা’ আর লেখা হবে না এই জীবনে

নিজের লেখা ‘প্রভৃতি’ গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেদ।

নীরবতা নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছা ছিল সিদ্দিক আহমেদের। নামও ঠিক করেছেন ‘চুপকথা’।

কিন্তু ক্যান্সারের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে চলা এই লেখক বলেছেন, ‘চুপকথা’ আর লেখা হবে না এই জীবনে।   কারণ তিনি এখন জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে নয়, মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন বলেই মনে করেন।

গত শুক্রবার বিকেলে নগরীর সিনিয়রস ক্লাবে নিজের লেখা ‘প্রভৃতি’ গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কথাগুলো বলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘একসময় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মেরেছি। অফিস থেকে বের হয়েছি, পেটে ক্ষুধা কিন্তু একজন ইয়ং বন্ধু যদি দেখে বলত দাঁড়ান, আমি দাঁড়িয়ে গেছি। আড্ডা দিয়েছি, কতদিন আহা কতদিন। হায়রে আড্ডা। অথচ এখন দুই মিনিটও দাঁড়াতে পারি না। হাঁটুর ব্যথা তো আছে। হাঁটুতে আর আগের মতো শক্তি নেই। মনের জোরে কতটুকু আর নদী বাওয়া যায়। মনের জোরে কতটুকু আর জীবনকে এগিয়ে নেওয়া যায়। জানতাম না, এভাবে আমি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ব। বসতে পারি না, পিঠে ব্যথা হয়ে যায়। চোখে দেখি না, এক চোখ অন্ধ। সব মিলিয়ে জীবনের যন্ত্রণা...। না, এটাও এক ধরনের আনন্দ। ’

অনুবাদক সিদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘মানুষ থেমে যায়, মানুষের পথচলা হয়ত থামে কিন্তু সৃষ্টিশীলতা কখনো থামে না।   জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোর ঠিকানা পেতে চাই। জীবনের স্বাদ পেতে চাই। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে মানুষের জীবন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুইয়ের মাঝখানে সফল একটা জীবন কাটানোর। আমি আমার ছেলেমেয়েদের বলেছি, তোমরা আমাকে কখনো ফাঁকি দিতে পার, হয়তো বলেছ কলেজে যাবে, কিন্তু যাচ্ছ নিউমার্কেটে। আমাকে ফাঁকি দাও, কিন্তু নিজেকে কখনো ফাঁকি দেবে না। আমিও কখনো নিজেকে ফাঁকি দিইনি। সবসময় নিজেকে নির্মাণের চেষ্টা করেছি। গর্ব করে বলতাম, চট্টগ্রামের লোকজন কেন আমাকে নতুন কথা শোনাবে। আমি শোনাব সবাইকে। এটা আমার অহংকার নয়, এটা আমার চেষ্টা ছিল। ’

নীরবতা নিয়ে বই লেখার অভিপ্রায় শোনাতে গিয়ে সিদ্দিক আহমেদ শুনিয়েছেন কথার শক্তির কথা। তিনি বলেন, ‘জীবনে কত কথা বলেছি। যখন মাতৃক্রোড়ে বসে মা, মা বলে কথা শুরু করেছি, এরপর থেকে জীবনের এই সময় পর্যন্ত কখনো ভালোবাসার কথা, কখনো রাগের কথা, কখনো সংস্কৃতির কথা, কখনো মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে গেছি। মানুষের জীবনের সব কথা যদি জমিয়ে রাখা যেত তাহলে দেখা যেত প্রত্যেকের জীবন একেকটা বই হয়ে যেত। জীবনে আমাদের কত কথা, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, স্ত্রীর সঙ্গে, সন্তানের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে। আবার অনেক সময় আমরা কথা বলি না, কিন্তু কথা বলি। যেমন মূকাভিনয়। চুপ থেকেও কিন্তু অনেক কথা বলা যায়। বোবা মানুষ কি কোনো কথা বলতে পারে? অঙ্গভঙ্গি করে। এটাও একটা ল্যাঙ্গুয়েজ। ’

প্রাবন্ধিক সিদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘আমার বইতে অনেক কথা আছে। কখনো নিজের সঙ্গে, কখনো সমাজের সঙ্গে, কখনো রাষ্ট্রের সঙ্গে, কখনো অন্যের সঙ্গে। কখনো অন্যকে শোনানোর জন্য কথা, কখনো নিজেকে শোনানোর জন্য কথা। কথার শক্তি অনেক। আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে কথা বলি, অভিনয় করি, সত্য-মিথ্যা সব। বইয়ের মধ্যে কথা, নাটকের মধ্যে কথা। এই কথার মধ্যেই কিন্তু জীবন। ’

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ‘প্রভৃতি’ গ্রন্থ প্রকাশে সহযোগিতার জন্য জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বৈশাখী টেলিভিশনের হেড অব নিউজ অশোক চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান সিদ্দিক আহমেদ। কবি অরুণ দাশগুপ্তের সভাপতিত্বে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন। আরো বক্তব্য দেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস, লেখক ফেরদৌস আরা আলীম, অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম, অধ্যাপক মুজিবর রাহমান, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে সিদ্দিক আহমেদের পছন্দের গান গেয়ে শোনান শিল্পী শাহরিয়ার খালেদ। এছাড়া প্রকাশনা পরিষদের পক্ষে সাংবাদিক কামাল পারভেজ, মহসিন কাজী ও হোসাইন তৌফিক ইফতেখার অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। আবির প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশ করেছেন লেখক মুহাম্মদ নূরুল আবসার।


মন্তব্য