kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘জমিদার’ পরিবারও কার্ড পাচ্ছে

৫০০ থেকে হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

উজ্জ্বল বিশ্বাস, বাঁশখালী   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘জমিদার’ পরিবারও কার্ড পাচ্ছে

জোহরা বেগম (৬০)। তাঁর স্বামী মীর আব্দুল কাদের সিকদার এলাকার পরিচিত মুখ।

বিপুল পরিমাণ জমি থাকায় ওই পরিবার এলাকায় ‘জমিদার পরিবার’ নামে পরিচিত। তিন ছেলের মধ্যে দুজন ওমান প্রবাসী, অন্যজন স্থানীয় একটি কলেজে চাকরি করেন। আর চার মেয়ের সবার বিয়ে হয়ে গেছে।

মো. আরিফ (১৮)। তার বাবা আমিনুল হক প্রায় ৪০ কানি জমির মালিক। তারা তিন ভাই। সে স্থানীয় একটি কলেজে পড়ে। তার বড় দুই ভাই এলাকায় বালুর ব্যবসা করেন। অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচ্ছল পরিবার।

ফরিদুল আলম প্রকাশ লালা মিয়ার মেয়ে বিউটি (২২)। পাকা দালানে তাঁদের বসবাস।

ওই তিনজন আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সদস্য হলেও পেয়েছেন দুস্থদের জন্য সরকারের বরাদ্দ ১০ টাকার চালের কার্ড। তাঁদের বাড়ি বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের নাপোড়া গ্রামের মীর সিকদারপাড়ায়। অথচ একই পাড়ার বাসিন্দা ভিক্ষুক বিধবা জুনী বেগম (৬০), হতদরিদ্র বিধবা হাকিমা বেগম (৫৫) এবং বিধবা করিমা বেগম (৩৫) সহ অনেকের ভাগ্যে জোটেনি সেই কার্ড।

বিউটি জানান, তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছনুয়া ইউনিয়নে। স্বামী পোশাক কারখানায় চাকরি করে মোটা অংকের বেতন পান। অনেকটা আরাম আয়াশে থাকার জন্য বাপের বাড়িতে থাকেন তিনি। সবাই নিচ্ছে তাই খুশিতে তিনিও কার্ড নিয়েছেন!

কলেজছাত্র মো. আরিফ বলেন, ‘আহমদ ছফা মেম্বার আমাকে কার্ড দিয়েছেন। প্রয়োজন হলে আমি গরিব কাউকে ওই কার্ড দিয়ে দেব। ’

আর জোহরা বেগম বললেন, ‘অসচ্ছল পরিবার হিসেবে কার্ড নিয়েছি। এতে ক্ষতি কী? এটাতো সরকারের দান। সবাই নিচ্ছে আমরা নিলে দোষের কী?’

ওই এলাকায় ১০ টাকায় চাল বিক্রির ডিলার বিমল কান্তি গুহের বিক্রয়কেন্দ্রে চাল উত্তোলনের সময় কার্ডধারী মো. এনাম, মো. কাঞ্চন, মুর্তুজা বেগম, ছকিনা বেগম, লায়লা বেগম, ফরুনি বেগম, ছৈয়দা খাতুন, মারুফা বেগমসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয়। অভিযোগ করে তাঁরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা দিয়ে তাঁরা ১০ টাকার চাল উত্তোলনের কার্ডটি পেয়েছেন। কার্ড দিতে টাকা নিয়েছেন এলাকার হেফাজ সিকদার, নুরুল আমিন, ফজলুল হক, মোস্তাক ও সাবেক ইউপি মেম্বার আহমদ ছফা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁশখালীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। সামনে যেকোনো সময় হতে পারে সেই নির্বাচন। আসন্ন নির্বাচনে সুবিধা নিতে সচ্ছল পরিবারগুলোকে কার্ড দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অবশ্য সাবেক ইউপি সদস্য আহমদ ছফা বলেন, ‘পরিবারগুলো আগে সচ্ছল ছিল, এখন গরিব। তাই কার্ড দেওয়া হয়েছে। আর টাকা নেওয়ার অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। কেউ ষড়যন্ত্র করে ফায়দা লুটতে ওই মিথ্যা অভিযোগ করে থাকতে পারেন। ’

ডিলার বিমল কান্তি গুহ বলেন, ‘আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। কখনো দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়াতে পারি না। আমাকে চাল বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৪, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৫৩৭ হতদরিদ্র পরিবারের কাছে। বাকী ৬২০ জনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরলিয়া বাজারের জাহাঙ্গীর আলমকে। ’ তিনি জানান, যাঁরা এসব কার্ডের তালিকা করেছেন, তাঁরাই অনিয়মে জড়িত থাকতে পারেন। তবে হতদরিদ্রদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ শুনেছেন জানিয়ে বিমল গুহ বলেন, ‘অনিয়ম তদন্ত করা প্রয়োজন। আর আমি নির্ধারিত কার্ডের ভিত্তিতে চাল বিক্রি করতে বাধ্য। হতদরিদ্র পরিবার আর সচ্ছল পরিবার তদারকি করা আমার দায়িত্ব নয়। ’

পুঁইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মইন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হলেও এসবে জড়িত নই। আমার হাত-পা বাঁধা। ওই তালিকায় আমার কোনো স্বাক্ষর কিংবা অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সুদত্ত চাকমা বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হতদরিদ্রদের চাল বিক্রি কর্মসূচিতে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। ’


মন্তব্য