kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুর্গোৎসব

বৃষ্টি উপেক্ষা করে মণ্ডপে মণ্ডপে পুণ্যার্থীর ঢল

নূপুর দেব   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বৃষ্টি উপেক্ষা করে মণ্ডপে মণ্ডপে পুণ্যার্থীর ঢল

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পূজামণ্ডপ। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিজয়া দশমীতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের শারদীয়া দুর্গোৎসব শেষ হচ্ছে আজ। এবারও চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান প্রতিমা বিসর্জন কেন্দ্র পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত।

সকালে দশমীবিহিত পূজার পর ৯টা ৪৯ মিনিটের মধ্যে দর্পণ বিসর্জন। এর মধ্যে মা দুর্গার শ্রীচরণে অঞ্জলি ও মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন করে নিজের, পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির শান্তি ও মঙ্গল কামনা করবেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।

অঞ্জলি দিয়ে দুপুরের পর থেকে নগর ও জেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে শোভাযাত্রা সহকারে দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে যাওয়া হবে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায়। সেখানে বিসর্জন উপলক্ষে ভক্ত-পূজার্থীর পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে লাখো মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছেন মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা।

প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে শঙ্খ, ঢাক-ঢোল, কাঁসা, জুরিসহ নানা বাদ্যবাজনায় মুখরিত হয়ে ওঠবে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা। বিসর্জন ঘিরে সেখানে বসবে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ যৌথভাবে সমুদ্রসৈকতে আজ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে রাত ৮টার মধ্যে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

নগরীর ১৫টি থানায় এবার ২৮৪ পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে। মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রত্নাকর দাশ টুনু গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতবছর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ১৬৭টি দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এবার সংখ্যা আরো বাড়বে। বিসর্জন উপলক্ষে সমুদ্রসৈকতের আশেপাশের প্রায় ৩/৪ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিমা আর মানুষ ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন দেখা যায় না। এবারও একই দৃশ্যের অবতারণা হবে। কয়েক লাখ লোকের সমাগম ঘটবে। ’

পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত ছাড়াও কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন স্থানে আজ প্রতিমা বিসর্জন হবে। এর মধ্যে নগরীর কালুরঘাট, অভয়মিত্র ঘাট ও গঙ্গাবাড়ী এলাকায় প্রচুর লোকসমাগম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে এবারও দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রার আয়োজন রয়েছে হাটহাজারী, ফতেয়াবাদ ও চৌধুরীহাট এলাকায়। এখানকার প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় ২৩টি পূজামণ্ডপের পক্ষ থেকে বেশির ভাগই দুপুরের পর স্ব স্ব মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রা সহকারে আনা প্রতিমাগুলো ফতেয়াবাদ পল্লী সংগঠন সমিতির মাঠে রাখা হবে বলে পূজা পরিষদের নেতারা জানান।

ফতেয়াবাদ পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান মেম্বার লিটন দাশ বলেন, ‘দুর্গাপ্রতিমা সড়কে প্রদক্ষিণকালে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। প্রদক্ষিণের পর স্ব স্ব মণ্ডপে গিয়ে আরতির পর স্থানীয় পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হবে। ’

বিজয়া দশমীর আগে গতকাল সোমবার ছিল মহানবমী পূজা। সকাল থেকে দিনভর থেমে থেমে কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে ভক্ত ও পূজার্থীরা মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় জমান।

দুপুরের পর থেকে ভিড় আরো বাড়তে থাকে। বিকেল থেকে শুরু উপচেপড়া ভিড় ছিল গভীর রাত পর্যন্ত। নবমী বিহিত পূজা, অঞ্জলি নিবেদন, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতিসহ ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ আর উলুধ্বনি, চণ্ডীপাঠ এবং আলোকসজ্জায় মুখরিত হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। সন্ধ্যার পর থেকে মণ্ডপগুলোতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের জে এম সেন হল, কুসুমকুমারী স্কুল, হাজারী গলি, রাজাপুকুর লেন, মোমিন রোড, উত্তর ও দক্ষিণ নালাপাড়া, পাথরঘাটা, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, আসকারদিঘির পাড় রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম, পাঁচলাইশ, বায়েজিদ, নন্দনকানন, ফিরিঙ্গীবাজার, সদরঘাট, খুলশী, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, হালিশহর, কাটগড়, ইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়। ভিড়ের কারণে আশেপাশের সড়ক যানজট সৃষ্টি হয়। অনেকে গাড়ির পরিবর্তে হেঁটেও মণ্ডপে যান। গত চার দিনের মধ্যে গতকালই সবচেয়ে বেশি লোকের সমাগম হয়।

প্রতিটি পূজামণ্ডপে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর কড়া নজরদারি। এছাড়া মণ্ডপে মণ্ডপে নিজেদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও ছিল। গত কয়েক বছর ধরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ‘থিম’ পূজাগুলো হয়ে আসছিল। কিন্তু এবার ৯০ শতাংশ মণ্ডপে ‘থিম’ ছিল না। এর পরও দর্শনার্থীদের উপস্থিতির কমতি নেই।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, মেয়র, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অরবিন্দ পাল ও সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাশ বলেন, ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। সবার সহযোগিতায় আজ শুভ বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পারব বলে আশাবাদী। ’

অপরদিকে চট্টগ্রাম জেলায় ১ হাজার ৬৮৯টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে। জেলার পূজামণ্ডপগুলো ছিল লোকে লোকারণ্য। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল পালিতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গতকালও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।

পূজা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অলক মহাজন বলেন, ‘গত দুদিন ধরে বৃষ্টি হলেও পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং গত বছরের চেয়ে এবার ভিড় বেশি। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনেও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বত্র উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা হচ্ছে। ’


মন্তব্য