kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বন্যহাতি তাড়াতে সৌর বিদ্যুতের তারের বেড়া

স্বস্তির পরিবর্তে বাড়াচ্ছে শঙ্কা

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বন্যহাতি তাড়াতে সৌর বিদ্যুতের তারের বেড়া

তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যুতের তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে বান্দরবানের সুয়ালকের ভাগ্যকুল গ্রামে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বন্যহাতির আক্রমণ থেকে মানুষ রক্ষায় বান্দরবানের ভাগ্যকুল গ্রামে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) দেওয়া সৌর বিদ্যুতায়িত তারের বেড়া স্বস্তির চেয়ে শঙ্কা বাড়াচ্ছে বেশি।

হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের শেষ দিকে এসে আইইউসিএন পরীক্ষামূলকভাবে বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের ভাগ্যকুল গ্রামে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ তারের বেড়া দেয়।

উদ্যোগটি ইতিবাচক ফল আনলে ভবিষ্যতে সুয়ালক, টংকাবতী ও রাজবিলা ইউনিয়নের হাতির আক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোতে ওই প্রকল্প সম্প্রসারণ করা হবে। এমন প্রস্তাব রেখে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ‘সোলার ফেন্সিং’ অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় বান্দরবান বন বিভাগের হাতে।

দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আইইউসিএন ও বন বিভাগ বলেছে, বন্যহাতির আক্রমণ থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রকল্পটি ইতিবাচক কাজ দেবে। কিন্তু হস্তান্তরের তিন দিনের মাথায় বিদ্যুত্স্পর্শ পেয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে একদল হাতি উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে পার্শ্ববর্তী কদুখোলা এলাকার নতুনপাড়ায় হামলা চালায়। এ সময় এক বৃদ্ধ নির্মমভাবে প্রাণ হারান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাতি ঠেকাতে বিদ্যুৎ তারের যে বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে, তা মাঝে মধ্যে মানুষকেও বিদ্যুত্স্পৃষ্ট করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দৈনন্দিন কাজ থেকে কোনো কারণে দেরিতে ফিরতে গিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়েছেন।

সুয়ালক ইউনিয়নের বাবুর্চিপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ এরশাদ সোলার ফেন্সিং প্রকল্পে কাজ করেন। তিনি জানান, কিছুদিন আগে তিনি হাতে সোলার বিদ্যুৎ শক খেয়েছিলেন। ওই ঘটনায় বড় ধরনের কোনো ক্ষতি না হলেও দুদিনেরও বেশি সময় ধরে তাঁর হাত প্রায় অবশ অবস্থায় ছিল।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভাগ্যকুল বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কের পাশ ঘেঁষে সাধারণ জিআই তারে সৌরবিদ্যুৎ সঞ্চালন ঘটিয়ে দুটি অংশে প্রায় তিন কিলোমিটার তারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। ভূমি থেকে সাড়ে ছয় ফুট উঁচুতে পাকা খুঁটির সাথে সমান্তরাল দুটি তার টেনে তাতে সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বিদ্যুতায়িত করা হয়েছে।

আইইউসিএন কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, এসব তারে ‘জিরো পয়েন্ট জিরো টু’ মাত্রার বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হওয়ার কারণে তাতে স্পর্শ লাগলে মানুষ বা হাতির বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা একেবারেই নেই। তবে তারের সংস্পর্শে এলে হাতি মৃদু আঘাত পাবে এবং ভয়ে পালিয়ে যাবে। একইভাবে মানুষও বিদ্যুৎ শক পাবে, তবে তা দুর্ঘটনার কোনো কারণ হবে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বান্দরবান বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী কামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দিনের বেলায় ফেন্সিংয়ে সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় না। মানুষজন কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর সন্ধ্যায় তারের বেড়াকে সৌরবিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সাথে যুক্ত করা হয়। ফলে এতে দুর্ঘটনার কোনো কারণ থাকতে পারে না। ’

তিনি জানান, হাতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্যে ভাগ্যকুল এলাকায় ১০টি ইআরটি টিম গঠন করা হয়েছে। তাঁদেরকে বন্য হাতির অভ্যাস, আচরণ এবং সোলার ফেন্সিং সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। বিদ্যুত্স্পৃষ্টতার কোনো ঘটনা ঘটলে তাঁরা নিজেরাই এর সমাধান দিতে পারবেন।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশ কয়েক দফায় ভারতের সোলার ফেন্সিং প্রকল্পের মাধ্যমে বন্যহাতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা নিতে প্রকল্পের আওতায় ২০ জনেরও বেশি বিদেশ সফর করেন। কিন্তু কদুখোলা বাজারের একজন পল্লী চিকিৎসক ছাড়া ভাগ্যকুল, কদুখোলা বা টংকাবতী এলাকার কোনো বাসিন্দাকে সুযোগটি দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরটি টিমের একজন সদস্য বলেন, ‘সোলার ফেন্সিং সম্পর্কে সম্যক কোনো ধারণা না থাকায় এই পদ্ধতি নিয়ে কারণে-অকারণে এলাকাবাসীর মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। ’ তিনি এ বিষয়ে আরো বেশি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।


মন্তব্য