kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মধ্যেও সক্রিয় হিযবুত তাহরীর

এস এম রানা   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মধ্যেও সক্রিয় হিযবুত তাহরীর

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মধ্যেও সক্রিয় রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীর। জঙ্গি দমনে ব্যস্ত সময় পার করছে র‌্যাব-পুলিশ।

প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে চলছে জঙ্গিবিরোধী অভিযান। তবে এসব অভিযানে যারা ধরা পড়ছে, এদের বেশির ভাগই জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) নেতাকর্মী। অনেকটা নিরাপদে রয়ে গেছে হিযবুত তাহ্রীরের নেতাকর্মীরা!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের দলে ভিড়িয়ে গোপন আস্তানা থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর। সংগঠনটি সময়ে সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসে ম্যাগাজিন ও প্রচারপত্র বিলি করে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জানান দিচ্ছে। ‘শক্ত অবস্থান’ জানান দিতে আকস্মিকভাবে বিভিন্ন মসজিদের সামনে কিংবা জনবহুল স্থানেও প্রচার চালায় এরা। এ ধরনের প্রচারপত্র বিলি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন পরবর্তীতে আদালত থেকে জামিনও পেয়েছে।

২০০১ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকে ‘খিলাফত রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করছিল হিযবুত তাহ্রীর। উগ্রপন্থী হওয়ায় ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহরীরের সব কর্মকাণ্ড সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর কিছুদিন স্থবির ছিল সংগঠনটির কার্যক্রম। পরবর্তীতে এরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

হিযবুত তাহরীরের কর্মকাণ্ড বন্ধে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সব সময় সতর্কভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের বেশ কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধার করে সংগঠনটিকে এক ধরনের স্থবির করে দিয়েছে। একইভাবে হিযবুত তাহ্রীরের কর্মকাণ্ডও দমন করা হবে। ’

তিনি জানান, দেশের স্বার্থেই র‌্যাব জঙ্গি দমনে অঙ্গীকারবদ্ধ। কাজ চলছে। সুুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই র‌্যাব জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে।

র‌্যাব সূত্র জানায়, ২০১১-১২ সালে তৈরি করা একটি তালিকায় চট্টগ্রামে হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য আছে বলে উল্লেখ আছে। তবে সেই তালিকায় অনেকেরই বিস্তারিত পরিচয় নেই। এ কারণে এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া অন্য জঙ্গি সংগঠনের মতো হিযবুত তাহরীর সদস্যরাও ছদ্ম পরিচয় ব্যবহার করে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুর দিকে চট্টগ্রামভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের তথ্য নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করে গোয়েন্দা পুলিশ। ৫৯ জনের ওই তালিকায় ১৪ জন ছিলেন হিযবুত তাহরীর সদস্য। তাঁদের বেশির ভাগই পরবর্তীতে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন। অন্যরা ছিলেন জেএমবি, হুজি ও শহীদ হামজা ব্রিগেডের সদস্য।

হিযবুত তাহরীরের প্রচারপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংগঠনটি সারাদেশে সক্রিয়। পুরুষ সদস্য ছাড়াও নারী সদস্যও আছে সংগঠনটির। গত আগস্ট মাসে ‘সংগঠনের পুরুষ ও নারী সদস্যদের পুলিশ হেনস্তা করছে’ উল্লেখ করে সংবাদপত্রে লিফলেট পাঠায় হিযবুত তাহরীর।

সারাদেশে হিযবুত তাহরীরের কী পরিমাণ সদস্য আছে এবং সংগঠনের অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে-সেই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা। জঙ্গি সংগঠনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে জেএমবি বা নব্য জেএমবি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত। এর মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কয়েকজন সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে জেএমবি বা নব্য জেএমবির পাশাপাশি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম সক্রিয় হয়েছে। এর বাইরে হুজি কিংবা হিযবুত তাহরীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচনায় আসেনি। যদিও নেপথ্যে জঙ্গি সংগঠনগুলো এদের কার্যক্রম চালাচ্ছে এটা বলা যায়। কর্মকর্তারা মনে করেন, হিযুবত তাহরীর সময়ে সময়ে প্রচারপত্র বিলি করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (বন্দর) নাজমুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগর পুলিশ ইতোমধ্যে আনসারুল্লাহ্ বাংলা টিমের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। পাশাপাশি হিযবুত তাহরীর সদস্যদেরও খোঁজা হচ্ছে। ’

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, হিযবুত তাহরীরের বর্তমান কর্মকাণ্ডে ‘প্রফেশনাল গ্রুপ’ হিসেবে কিছু সমর্থক জড়িত। গ্রেপ্তার হওয়ায় হিযবুত তাহরীরের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমন তথ্য পেয়েছে। এখন এই সংগঠনের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা জড়িত। এ কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এরা সদস্য সংগ্রহ অভিযান চালাচ্ছে। ভবিষ্যতে সংগঠনটি বেপরোয়া হয়ে ওঠতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

কর্মকর্তাদের মতে, হিযবুত তাহরীর সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার ও দলীয় প্রচার বাড়াতে নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম বেগবান করতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ীসহ উচ্চ-মধ্যবিত্তদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। সংগঠনটির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞও জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে।


মন্তব্য