kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইয়াবা পাচারে ‘মহামারী’

এস এম রানা   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ইয়াবা পাচারে ‘মহামারী’

‘মহামারী’ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা পাচার। গত পাঁচ বছরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ইয়াবার উদ্ধারচিত্র পর্যালোচনা করে এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উদ্ধারচিত্র অনুযায়ী, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ইয়াবা পাচার হলেও ‘মহামারী’ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এর পরের বছর। যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১২ থেকে তিন বছরে র‌্যাব উদ্ধার করে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ইয়াবা। ২০১৫ সালে তা একলাফে বেড়ে ৩২ লাখ ৬৩ হাজারে পৌঁছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮২৭ ইয়াবা।

তরুণ সমাজের একটি অংশের রাতারাতি ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, কতিপয় শিল্পপতির বিনিয়োগ, সমাজের দরিদ্র একটি অংশের জীবিকার সন্ধানে বেআইনি পথে হলেও বিপুল অর্থ উপার্জনের লক্ষ্য- এসব কারণে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। ইয়াবা পাচার এক সময় রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও দেশের সব জেলায় কমবেশি ইয়াবার ছোবল পড়েছে। যদিও ইয়াবার চাহিদা এখনো ঢাকায় সর্বাধিক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, স্থলপথে ইয়াবা পাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার পর সাগরপথে বেশি ইয়াবা পাচার হচ্ছে। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও র‌্যাব ইয়াবা পাচারের বড় বড় চালান আটক করলেও ‘ইয়াবাস্রোত’ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও নৌবাহিনী ইয়াবা উদ্ধার অভিযান চালায়।

র‌্যাব-৭ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ৩২ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯৭ ইয়াবা উদ্ধার করে। আর চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার করেছে ৫৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮২৭টি। অর্থাৎ গত বছরের ১২ মাসে উদ্ধার করা ইয়াবার চেয়ে চলতি বছরের ৯ মাসে ১২৯ শতাংশ ইয়াবা বেশি উদ্ধার হয়েছে। বছরের পরবর্তী তিন মাসে উদ্ধারচিত্র আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে শতাংশের হিসাবে ১৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী এবং টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় বিজিবি নিয়মিত ইয়াবাবিরোধী অভিযান চালায়। এর মধ্যে র‌্যাবের অভিযানের চিত্র পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, ইয়াবা পাচারের ‘মহামারী’ কতোটা ভয়াবহ।

ইয়াবা পাচার অপ্রতিরোধ্য হওয়ার ক্ষেত্রে কতিপয় অতি লোভী কারবারি, উঠতি বয়সের অনেক তরুণের রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া কয়েকজন শিল্পপতি ইয়াবা পাচারে বিনিয়োগ করেছেন বলেও র‌্যাবের কাছে তথ্য আছে।

র‌্যাব-৭ এর মতো চট্টগ্রাম নগর পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানের চিত্র বিশ্লেষণ করেও ইয়াবা উদ্ধারের চিত্রের ঊর্ধ্বগতির ধারা লক্ষ করা গেছে। এসব সংস্থারও অভিযান, মামলা এবং গ্রেপ্তার-তিনটিই বেড়েছে।

সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ভয়াবহ মাদকের তালিকায় ১ নম্বর থাকা ইয়াবা এখন মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যা ‘মহামারী’ আকার ধারণ করছে বলে বলা যায়। ইয়াবার চাহিদা, জোগান এবং আটক অভিযান তিনটিই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। উদ্ধারকৃত ইয়াবাগুলোর দিকে তাকালে আটক অভিযান বিষয়ে যেমন সন্তোষ প্রকাশ করা যায়, তেমনি উল্টোভাবে ভাবলে; আতঙ্কিত ও শিহরিত হতে হয়, কতোটা ভয়ঙ্কর থাবা দিয়েছে যুবসমাজের ওপর। চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই জোগান বাড়ছে। সেই তুলনায় সব ইয়াবার চালানতো আটক হচ্ছে না। তাই ধরে নেওয়া যায়, ইয়াবার চাহিদা ও জোগান দুটোই ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে।

ইয়াবা পাচারে বড় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েছেন-এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইয়াবার বড় চালানগুলো আসছে সমুদ্রপথে। মাছধরার ট্রলারে কৌশলে পাচার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, এসব ট্রলারে ১০-১২ লাখ করেও ইয়াবা পাচার হচ্ছে। ’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সমুদ্রপথে ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রে অতীতের চেয়ে অনেক বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে এখন। সেই কারণে বড় বড় কয়েকটি চালান জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। ’

শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা ইয়াবা পাচারে পুঁজি বিনিয়োগ করছে-এমন তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কয়েকজনের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। ’

র‌্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক চন্দন দেবনাথ জানান, র‌্যাব-৭ টেকনাফ থেকে ফেনী এলাকা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে। ২০১২ সালে র‌্যাব-৭ এক লাখ ৭ হাজার, ২০১৩ সালে দুই লাখ ২৫ হাজার, ২০১৪ সালে সাত লাখ ২৪ হাজার এবং ২০১৫ সালে ৩২ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯৭ ইয়াবা উদ্ধার করেছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৫৫ লাখ ৬৫ হাজার।

ইয়াবা উদ্ধারচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকে ‘মহামারী’ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা পাচার। ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে তিন বছরে যেখান ১০ লাখ ৫৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল, সেখানে ২০১৫ সালে উদ্ধার হয় ৩২ লাখ ৬৩ হাজার। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮২৭টি।

ইয়াবার বিস্তার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এক. অভিযান বেড়েছে, তাই উদ্ধার বেড়েছে। র‌্যাব সাহসিকতার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুই. চাহিদা বেড়েছে। তাই জোগানও বেড়েছে। ’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে করেই হোক, যুব সমাজকে ইয়াবার থাবা থেকে রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। আর অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, ইয়াবার বিস্তার বাড়ছে। ’


মন্তব্য