kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

শঙ্খের ইলিশ

জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শঙ্খের ইলিশ

শঙ্খ নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ইলিশ। ছবিটি সাতকানিয়ার বোমাংহাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

শঙ্খ নদীর মাছের ভাণ্ডারে যোগ হয়েছে ইলিশ। সমপ্রতি নদীটিতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ইলিশ।

তবে মিঠাপানিতে বিচরণের কারণে এখানকার ইলিশের রঙ সাগরের ইলিশের চেয়ে একটু বেশি সাদা। আগে শুধু প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য শঙ্খের মোহনায় আসত মাছের এই রাজা। এখন নদীর যে এলাকায় জোয়ারের পানি ঢুকে সেই এলাকায় বেশি মেলছে ইলিশ।

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের গহিন অরণ্যের ঝর্নাধারা থেকে সৃষ্ট শঙ্খ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের বুক চিরে বাঁশখালীর খানখানাবাদ এবং আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বার আউলিয়া এলাকায় বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। ফলে প্রতিদিন বঙ্গোপসাগর থেকে নদীতে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। এতে শঙ্খের কিছু এলাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। তাই শঙ্খেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, শঙ্খের মোহনায় এবং নদীতে ঢুকে পড়া ইলিশ রক্ষা ও নিরাপদ প্রজননের স্বার্থে সরকার নির্ধারিত ২২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সাগরের পাশাপাশি শঙ্খেও সব ধরনের মাছ ধরার ওপর বিধিনিষেধ থাকা উচিত।

সাগরের ইলিশ শঙ্খে পাওয়া যাওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও নদীবিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, ‘এটি একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মূলত ডিম ছাড়ার জন্য মিঠা পানিতে চলে আসে। আবার খাবারের জন্য লবণাক্ত পানিতে চলে যায়। তাই প্রতিবছর প্রজননের সময় শঙ্খেও ইলিশ পাওয়া যায়। ’

তিনি জানান, শঙ্খ একটি জোয়ার-ভাটার নদী। ফলে জোয়ারের সময় বঙ্গোপসাগর থেকে শঙ্খের কিছু এলাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। তাই ওই এলাকায় ইলিশ পাওয়াটা স্বাভাবিক।

সাতকানিয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী বাঁশখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা লুত্ফুর রহমান বলেন, ‘ইলিশ লোনাপানির মাছ। ইলিশের পুরো জীবন লবণাক্ত পানিতে কাটে। শুধু ডিম ছাড়ার জন্য প্রজনন মৌসুমের নির্দিষ্ট কিছু সময় মিঠাপানিতে আসে এরা। তবে মিঠাপানিতেও ইলিশ বেঁচে থাকে। ’

তিনি জানান, নদী, পুকুর ও খালে ইলিশের চাষ করা যায় কি না সেই বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে মিঠা পানিতে ইলিশ বেঁচে থাকে।

সাগর এবং শঙ্খ নদীর ইলিশের স্বাদে পার্থক্য থাকবে কি না-প্রশ্নের জবাবে এই মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘ইলিশ লবণাক্ত পানির মাছ বলে সাগরে থাকলে বেশি স্বাদ হবে এমন কোনো কথা নেই। সাগরের ইলিশের চেয়ে পদ্মার ইলিশের স্বাদ বেশি। ফলে শঙ্খ নদীতে পাওয়া ইলিশের স্বাদও কম বেশি হতে পারে। ’

তিনি জানান, মূলত ইলিশের প্রোটিন গঠনের বিভিন্ন উপাদানের কারণে স্বাদ কম বেশি হয়ে থাকে। একেক জায়গার স্বাদ একেক রকম। ফলে কোথাকার ইলিশের স্বাদ কম বেশি হবে তা বলা মুশকিল।

চন্দনাইশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘শঙ্খে ইলিশ পাওয়ার বিষয়টি শুনেছি। তবে বিচরণের বিষয়টি আমার দেখার সুযোগ হয়নি। উজান ভাটার নদীতে উজানের সময় ইলিশ মিঠাপানিতে ঢুকে পড়তে পারে। আবার ভাটার সময় চলেও যায়। এছাড়া প্রজনন মৌসুমে অবশ্যই মিঠাপানিতে চলে আসবে। পরে লবণাক্ত পানিতে ফিরে যায়। ’

ইলিশ মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ার পর যে পোনা হয় সেগুলো কোথায় থাকবে-প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিম ছাড়ার পর পর মিঠা পানিতে থাকে। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে খাদ্যের সন্ধানে লবণাক্ত পানির দিকে ফিরে যাবে। এর মধ্যে কয়েকটা নদীতে রয়ে গেলে সেটা অস্বাভাবিক নয়। ’

শঙ্খের তীরবর্তী হাটবাজার ঘুরে দেখা যায়, সাগরের ইলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জেলেরা নদীতে পাওয়া ইলিশও বিক্রি করছেন। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। সম্প্রতি সাতকানিয়ার বাজালিয়ার বোমাংহাটে পুরানগড়ের জেলে কাজল জলদাস শঙ্খে পাওয়া বিভিন্ন আকারের পাঁচটি ইলিশ বিক্রি করতে আনেন। শঙ্খের ইলিশ হওয়ায় এসব মাছ নিয়ে ক্রেতাদের মাঝে একটু বেশি আগ্রহ লক্ষ করে গেছে। সাগরের ইলিশের চেয়ে বেশি দামে বিক্রিও হয়েছে ইলিশগুলো।

কাজল জলদাস জানান, শঙ্খ নদীর সাতকানিয়ার পুরানগড়ের নয়াহাট এলাকায় তিনি ইলিশগুলো পেয়েছেন। এর আগেও কয়েকবার তাঁর জালে ইলিশ ধরা পড়েছিল। তিনি বলেন, ‘এমনিতে বাজারে শঙ্খের মাছের চাহিদা বেশি। ইলিশ হলে তো কথাই নেই! বাজারে আনার সাথে সাথে বিক্রি হয়ে যায়। ’

সুধীর জলদাস জানান, বাঁশখালীর খানখানাবাদ এবং আনোয়ারার বার আউলিয়ায় শঙ্খ নদী সাগরে মিলিত হয়েছে। জোয়ারের পানি শঙ্খের সাতকানিয়ার পুরানগড় এলাকা পর্যন্ত আসে। ফলে জোয়ারে সাগরের ইলিশ শঙ্খে ঢুকে পড়ছে। এখন এলাকার জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে। অতীতে পুরোবছর মিলে নদীতে কেউ একটা ইলিশ পেলে সেটা নিয়ে হৈ হল্লোাড় পড়ে যেত। কিন্তু চলতি বছর অনেক জেলের জালে ইলিশ পড়তে শুনেছি এবং বাজারে দেখাও যাচ্ছে।

বাজালিয়া বোমাংহাটের ইজারাদার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘বাজারে মাঝে মধ্যে স্থানীয় জেলেদের জালে পড়া শঙ্খের ইলিশ আসে। লোকজন চড়া দামে তা কিনেও নেন। আমিও নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সাগরের ইলিশের চেয়ে শঙ্খের ইলিশ স্বাদ কম। ’

নুরুল হক নামে এক ক্রেতা জানান, বড় আকারের হলে সাগরের ইলিশের চেয়ে শঙ্খের ইলিশের স্বাদ অনেক ভালো।


মন্তব্য