kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মনজুর আওয়ামী লীগে ফিরছেন?

নূপুর দেব   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মনজুর আওয়ামী লীগে ফিরছেন?

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক এই উপদেষ্টা আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো মুহূর্তে তাঁর আগের দল আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

গত শনিবার বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের পতাকা উত্তোলন করেন মনজুর আলম। ওই অনুষ্ঠানে তাঁর ‘রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রধান অতিথি ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের পর থেকেই মহিউদ্দিনের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে ‘শিষ্য’ মনজুর আলমের আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

দলীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন, এবার কি তাহলে আওয়ামী লীগে ফিরে যাচ্ছেন?-প্রশ্ন করা হলে মুচকি হেসে মনজুর আলম গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে যোগ-বিয়োগের কোনো বিষয় নেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার আদর্শ। তাঁর আদর্শ ধারণ করেই আছি। প্রায় ১৫ বছর আগে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছিলাম। আমি মানুষের জন্য কাজ করি। আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। আজীবন মানুষের জন্য কাজ করে যাব। ’

আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকা উত্তোলন করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওঠা আমার আদর্শের পতাকা, চেতনার পতাকা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আমাদেরকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে দলে যোগদান করা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। নিলে অবশ্যই জানতে পারবেন। ’

মনজুর আওয়ামী লীগে যোগদান করছেন কি না জানতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে গত শনিবার নগরের উত্তর কাট্টলী মোস্তফা হাকিম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘কেউ দলের পতাকাতলে আসতে চাইলে বাধা দিবেন না। যাঁরা আওয়ামী লীগের পতাকাতলে আসতে চান তাঁদেরকে উৎসাহিত করবেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের পক্ষে সাবেক মেয়র মনজুর আলম আজকে গুণীজনকে যেভাবে সংবর্ধিত করেছেন তা আগামী প্রজম্মের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। ’

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ৪৪ গুণী ব্যক্তিকে ওই অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেয়। অনুষ্ঠানের মঞ্চে পাশাপাশি বসেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মনজুর আলম। ফাউন্ডেশনের সভাপতি হলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং সদস্য সচিব মনজুর আলম।

ওই অনুষ্ঠানের পর মনজুর আলম উপস্থিত সংবাদকর্মীদের বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার নেতা, চট্টগ্রামের নেতা। মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিকল্প আর হবে না। তিনি মেয়র থাকাকালে আমাকে বারবার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কাজ শিখেছি। তাঁর কারণেই আমি মেয়র হয়েছি। ’

এর আগে ১৫ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতীয়  শোক দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর পর থেকে সাবেক বিএনপি নেতা মনজুরের আওয়ামী লীগে ফেরা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এছাড়া আরো কয়েকটি অনুষ্ঠানেও মহিউদ্দিন-মনজুরকে একসঙ্গে দেখা গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন ওঠেছে মহিউদ্দিন চৌধুরী এখন মনজুরকে দলে ফেরাতে চান।

এদিকে মনজুরের আওয়ামী লীগে যোগদান করা নিয়ে দলে এখনো কোনো মতবিরোধ স্পষ্ট হয়নি। তবে যোগদান না করা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নগরের কোনো নেতা কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গণনার কয়েক ঘণ্টা আগে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়র পদে নিজের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন বিএনপির প্রার্থী মনজুর। ওই সময় তিনি আর রাজনীতি করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে তিনি ও তাঁর পরিবার আওয়ামী লীগ সমর্থিত। ক্ষমতার লোভে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। সামনে বিভিন্ন নির্বাচন আসছে। সেখানে কোনো একটিতে দলের মনোনয়ন পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন তিনি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, ‘সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমের পরিবার আওয়ামী লীগ ঘরানার। তিনি আমাদের দলে ছিলেন। এখন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসাটা স্বাভাবিক। দলে তাঁর অনেক অবদান আছে। ’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনে টানা অংশ নেন শিল্পপতি এম মনজুর আলম। এর মধ্যে প্রথম তিনটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদে লড়ে বিজয়ী হন। ২০১০ সালের ১৭ জুন করপোরেশনের চতুর্থ নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির সমর্থন পান তিনি। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের হ্যাটট্রিক বিজয়ী মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেন। করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে লড়ার একমাস আগে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করেন।

টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মনজুর ২০১০ সালের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ পান। তবে তিনি বিএনপির মেয়র নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু দলীয় কর্মসূচিতে না যাওয়ার কারণে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য পদ চলে যায়। বিএনপির রাজনীতিতে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল মনজুর আলম রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

ওই দিন চোখভরা অশ্রু নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনজুর আলম বলেছিলেন, ‘আমি আর রাজনীতি করব না। সমাজ নিয়ে থাকব। সামাজিক কাজ করব। এটাই আমার শেষ নির্বাচন। রাজনীতি থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। ’

জানা গেছে, মনজুর আলমের বাবা মরহুম আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টর নগরীর ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। মনজুর আলম বিএনপির সমর্থনে গতবার মেয়র হলেও তাঁদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মোস্তফা হাকিম ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালিত হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু বাংলা বিদ্যাপীঠ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। মনজুর প্রথমবার কাউন্সিলর হওয়ার পর ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন।


মন্তব্য