kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৫২ বছরে ১০ হাজার প্রতিমা তৈরি করেছেন নেপাল

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



৫২ বছরে ১০ হাজার প্রতিমা তৈরি করেছেন নেপাল

৭৭ বছর বয়সী নেপাল ভট্টাচার্য ৫২ বছর ধরে তৈরি করছেন দুর্গোৎসবের প্রতিমা। তাঁর বাড়ি কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী সরস্বতী বাড়িতে।

এ পর্যন্ত তিনি ১০ হাজারের বেশি প্রতিমা তৈরি করেছেন বলে তাঁর দাবি।

কক্সবাজার শহরের ‘আর্ট সেন্টার’ নামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক পঞ্চানন বাবুর কাছে সাইনবোর্ড লেখা শেখার মাধ্যমেই তাঁর হাতেখড়ি। এক পর্যায়ে জীবনের তাগিদে মৃিশল্পকে তিনি পেশা হিসেবে নেন। ওই সময় চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে মৃিশল্পী হিসেবে তিনি একজনই ছিলেন বলে প্রকাশ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে সব পূজার প্রতিমা তৈরির একমাত্র কারিগরও ছিলেন তিনি! শুরুতে তিনি বিনা খরচে প্রতিমা তৈরি করে দিতেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ‘শ্রেষ্ঠ মৃিশল্পী’ হিসেবে খেতাবও পেয়েছেন নেপাল। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে প্রতিমাশিল্পী হিসেবে কাজ করছেন। এখনো ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেন। তাঁর সংসারে আছে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেরা স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে তাঁর কাজে সহযোগী হয়েছেন। নেপালের কাজে আরো সহযোগিতা করেন ১০ কর্মচারী।

শিল্পী নেপাল ভট্টাচার্য প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি পীযুস চৌধুুরী বলেন, ‘তিনি আসলেই একজন গুণীশিল্পী। সমাজে তাঁর মতো একনিষ্ঠ লোকের বড়ই অভাব এখন। ’

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা বলেন, ‘কক্সবাজার তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামে দুর্গাপূজায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা তৈরি করে দিয়ে আসছেন নেপাল ভট্টাচার্য। এমন একজন গুণীশিল্পীকে আমরা এখনো যথাযথ মর্যাদা দিতে পারিনি। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ’

শিল্পী নেপাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জীবনের ৫২ বছর ধরে প্রতিমার গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছি। ভোর থেকে গভীর রাত অবধি উদোম গায়ে কাজ করছি। অথচ সময় পাচ্ছি না গায়ের জামা পরার! জীবনের হিসাব-নিকাশও করিনি কখনো। একটি ব্যাংক হিসাবও নেই আমার। বলেন তো এটা কেমন জীবন!’

আসন্ন দুর্গাপূজা নিয়ে শিল্পী নেপালের নাওয়া-খাওয়া অনেকটা বন্ধ। গত পাঁচদিন ধরে তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থেকে গতকাল শনিবার সুযোগ মেলে। ওই পাঁচদিন তিনি টেকনাফের হ্নীলা, সাতকানিয়া ও উখিয়ায় প্রতিমা তৈরির কাজ করে ঘরে ফিরেন শনিবার সকালে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্গাপূজার কয়েক মাস আগে থেকে নেপালকে বিভিন্ন স্থানে ছুটতে হয় প্রতিমা তৈরির কাজ তদারকি করতে। প্রতিবছর কমপক্ষে গড়ে ৩০ সেট করে প্রতিমা তিনি নিজেই তৈরি করেন। প্রতিসেটে একটি মাদার প্রতিমা এবং আরো সাতটি থাকে সাইড প্রতিমা। সেই হিসাবে বছরে তিনি শুধু দুর্গাপূজার সময় তৈরি করেন ২১০টি প্রতিমা। এছাড়া এমনিতে সারা বছর তাঁর বাড়ির আঙিনায় প্রতিমা তৈরির কাজে তিনি ব্যস্ত সময় কাটান। এভাবে তিনি গত ৫২ বছরে ১০ হাজারেরও বেশি প্রতিমা তৈরি করেছেন বলে জানান তিনি। প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়ায় প্রতি সেট প্রতিমায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় নেপাল ভট্টাচার্য কক্সবাজারের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম মোজাম্মেল হক ও নজরুল ইসলাম চৌধুরীসহ অনেকের সাথে বার্মায় (মিয়ানমারে) আশ্রয় নেন। ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে আবারও পুরনো কাজে নেমে পড়েন। নেপাল ভট্টাচার্য ভাস্কর্য নির্মাণেও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। স্বামী অদ্বৈতানন্দপুরী মহারাজ, স্বামী জ্যোতিশ্বরানন্দগিরি মহারাজ, চিন্তাহরণপুরী মহারাজ, আদিত্য মোহন ব্রজবাসীসহ অনেক মহাপুরুষের ভাস্কর্য তৈরি করেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমাকে ভাস্কর্যে রূপ দেন নেপাল।

কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন নেপাল। অভাব-অনটনের কারণে তাঁকে সংসারের হাল ধরতে হয়। তবু তাঁর সৃজনশীল কাজ থেমে থাকেনি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে তাঁর অবাধ বিচরণ। ছবি আঁকেন। নাটকে অভিনয়ও করেছেন। গান করেন আবার নাটক পরিচালনা করেছেন কয়েকটি। যাত্রাশিল্পী হিসেবেও তাঁর পরিচিত আছে। পুঁথিপাঠেও পেয়েছেন জনপ্রিয়তা।

এছাড়া তিনি তবলা, ঢাক, মৃদঙ্গ,  ঢোল,  নাল,  খমক, মন্দিরা, খঞ্জনী বাদক হিসেবে এলাকায় বিশেষভাব পরিচিত। তিনি বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সাথে আশির দশকে একই নাট্যদলে কাজ করেন। নেপাল ভট্টাচার্যের কাছ থেকে তালিম নিয়ে তবলাবাদক ও সংগীত শিল্পী হয়েছেন কক্সবাজারের অনেকে।


মন্তব্য