kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মিয়ানমার থেকে কম খরচে কম সময়ে পণ্য আসবে চট্টগ্রামে

সরাসরি জাহাজ চালুর অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা

আসিফ সিদ্দিকী   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মিয়ানমারের সিটওয়ে (সাবেক আকিয়াব) বন্দরের নৌপথের দূরত্ব মাত্র ২৭৭ নটিক্যাল মাইল। ছোট জাহাজে সরাসরি ওই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে বড় জোর ২৪ ঘণ্টা।

ফলে রাখাইন প্রদেশে উত্পাদিত মাছ, চাল ও লবণসহ প্রচুর পণ্য অনেক কম খরচে ও কম সময়ে চট্টগ্রামে আনা যায়। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে নৌ-প্রটোকল চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় সুযোগটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অথচ মিয়ানমারের পণ্য ইয়াংগুন বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং বন্দর হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছতে সাগরে সোয়া তিন হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে ১০ গুণ বেশি সময় লাগছে। আর পণ্য পরিবহনের খরচও অনেক বেশি গুনতে হচ্ছে। এক থেকে পাঁচ হাজার টনের জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিলে দুই দেশই লাভবান হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কম খরচে ও কম সময়ে পণ্য পরিবহনের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গত

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম চেম্বারে ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক করেন মিয়ানমার রাখাইন চেম্বারের বাণিজ্য প্রতিনিধি দল। উভয় পক্ষ চট্টগ্রাম-সিটওয়ে সরাসরি উপকূলীয় জাহাজ চলাচল শুরুর তাগাদা দিয়েছেন। বৈঠকে মিয়ানমারের সাথে

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে জড়িত ব্যবসায়ী এবং রাখাইন চেম্বারের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের বাণিজ্য প্রতিনিধিদল অংশ নেন।

মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান তিন অং উ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে এখন যে পরিমাণ লবণ, মাছ ও চাল উত্পাদিত হয় সেই পরিমাণ ভোক্তা আমাদের নেই। রাখাইন রাজ্য থেকে ইয়াংগুনের সড়কপথে ৫৬৫ মাইল পাড়ি দিয়ে সেখানেও এসব পণ্য নেওয়া যায় না। ফলে বছর শেষে প্রচুর পরিমাণ পণ্য উদ্বৃত্ত থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে আমরা চট্টগ্রামকে সাথে চাই। ’ তিনি আরো বলেন, ‘রাখাইন রাজ্য থেকে চট্টগ্রামে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেলে আমরা নিজেরা উত্পাদন বাড়িয়ে স্বাবলম্বী হব। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাও চাইলে মিয়ানমারের সাথে যৌথ উদ্যোগে এগ্রোবিজনেসে বিনিয়োগ করতে পারে। ছোট জাহাজে উপকূলজুড়ে পণ্য পরিবহন চালু হলে অনেক কম খরচে চট্টগ্রামে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব। ’

সম্ভাবনার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মাহবুবুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে যদি আমরা সরাসরি পণ্য আনতে পারি তাহলে পণ্যের দাম অনেক কম হবে। ভোক্তারা অনেক কমদামে পণ্য কিনতে পারবেন। তৃতীয় দেশ হয়ে পণ্য আনতে গিয়ে দীর্ঘসময় লাগছে। ’ তিনি জানান, দুই দেশের ব্যবসা বাড়াতে হলে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। বর্তমানে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে তিন দিনের প্রবেশ পাস নিয়ে ব্যবসায়ীরা শুধুমাত্র মংড়ু যেতে পারেন। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অন্য রাজ্য থেকে পণ্য কিনে আনার সুযোগ নেই। বাণিজ্য বাড়াতে ব্যাংকিং লেনদেনের সীমা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।

জানা গেছে, কিছুদিন আগে একটি শিপিং লাইন চট্টগ্রাম-মিয়ানমার রুটে সরাসরি কন্টেইনার জাহাজ সার্ভিস চালু করে। থাইল্যান্ডের লেইম চাবাং বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে ভিয়েতনামের হো চি মিন বন্দরে পণ্য নিয়ে সিঙ্গাপুর-পোর্ট

কেলাং-ইয়াংগুন হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য নামিয়ে কলকাতার হালদিয়া বন্দর এবং ভারতের চেন্নাই, কোচিন ও নভোসেবা এই তিনটি বন্দর পর্যন্ত গিয়েছিল। এতে মিয়ানমারের পণ্য সরাসরি চট্টগ্রাম পৌঁছেছিল। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে জাহাজটির এজেন্ট মিনশেং শিপিং লাইনের মহাব্যবস্থাপক খায়রুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেই সময় মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহনে প্রচুর সাড়া পেয়েছিলাম। একই সাথে আমরা মিয়ানমারের পণ্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের বন্দরগুলোয় পৌঁছে দিয়েছিলাম। কিন্তু মালিকানা জটিলতায় পড়ে

সম্ভাবনাময় সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়। ’

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে কাঠের লগ (গুঁড়ি) ছাড়া অন্য কোনো পণ্য মিয়ানমার থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে না। মিয়ানমারের পণ্য ছোট জাহাজে টেকনাফ স্থলবন্দরে এসে ট্রাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এতে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এদিকে মিয়ানমারের সাথে উপকূলীয় জাহাজ চলাচলের জন্য দুদেশের মধ্যে অনেক আগেই সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। নৌ-প্রটোকলের আওতায় কীভাবে এই সার্ভিস চালু করা যায় এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও জমা পড়েছে

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে। জানতে চাইলে নৌ প্রটোকল তৈরির সাথে সম্পৃক্ত সদস্য ও গালফ সি ওরিয়েন্টের কর্ণধার শেখ মাহফুজ হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বিষয়টি স্বাক্ষরিত হওয়ার জন্য চূড়ান্ত হয়ে আছে। কিন্তু অনেকদিন ধরেই বিষয়টি চাপা পড়ে থাকায় সুফল মেলছে না। ’

তিনি জানান, ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের ১০টি বন্দরের মধ্যে ন্যূনতম মাশুল দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ মিলবে। কারণ সেই ছোট জাহাজগুলোকে দুই বাণিজ্যিক জাহাজ হিসেবে গণ্য করা হবে না। ফলে বাড়তি মাশুল দিতে হবে না।

সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এস এম নুরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্য কতটা বেড়েছে তা দুটি সংস্থার সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু দেখেই আঁচ করা যায়। গুনধুম হয়ে সড়ক যোগাযোগের প্রকল্পও বাস্তবায়ন হচ্ছে। আগামীতে রেল যোগাযোগও চালু হবে। এখন এলসি বা ঋণপত্রের মাধ্যমে ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করা হলে পুরো সুফল পাবেন দুই দেশের ব্যবসায়ী। ’


মন্তব্য