kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


২৪ ঘণ্টায় পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না

নজরুল ইসলাম, বোয়ালখালী   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



২৪ ঘণ্টায় পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ। এসব এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না।

একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ছয় ঘণ্টায়ও আসে না। আবার এলেও অনেক সময় কয়েক মিনিট পর চলে যায়। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পৌঁছেছে চরমে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি ট্রান্সফর্মার পুড়ে যাওয়ায় ওই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন ট্রান্সফর্মার আনা হয়েছে। তবে এটি সংযোজন করে পুরোদমে উত্পাদন ও বিতরণে যেতে আরো দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

গতকাল বুধবার বোয়ালখালীতে সকাল ১০টায় বিদ্যুৎ চলে যায়। বিকেল চারটায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও বিদ্যুৎ আসেনি। ফলে অফিস-আদালতের কাজে স্থবিরতা ছাড়াও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠেছে চরমে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয় শ্বাসকষ্টের রোগী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা। অনেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। স্থানীয় সব ব্যাংকে অনলাইন সেবা থাকায় পিক আওয়ারে বিদ্যুতের অভাবে সুষ্ঠুভাবে ব্যাংকে কাজকর্মও সারা যাচ্ছে না বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

এদিকে বোয়ালখালী এলাকার সাধারণ মানুষের অনেকে বলছেন, গত ১৩ আগস্ট ঘটা করে বোয়ালখালীকে ‘শতভাগ বিদ্যুতায়িত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। আর সেই এলাকায় চলছে চরম বিদ্যুৎ সংকট। আশ্বিনের এই গরমে দিনে এদিক-ওদিক করে কোনোরকমে সময় পার করা গেলেও রাতে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অনেকে নির্ঘুম রাত কাটান। প্রতিকার না পেয়ে জনগণ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠছে। যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে উত্পাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থায় কর্ণফুলী উপজেলার শাহমীরপুর থেকে পৃথক সঞ্চালন লাইনে বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারায় স্বল্প পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে ওই সঞ্চালন লাইনে প্রয়োজনীয় ধারণক্ষমতা না থাকায় এসব এলাকায় ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে নজিরবিহীন লোডশেডিং। এসব উপজেলা মোট চাহিদার তিন ভাগের একভাগও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না এখন।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আজহার আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করতে কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রান্সফর্মারটির ওজন প্রায় ৬০ টন। ফলে এটি পুনঃস্থাপনে পরিবহনসহ কিছু সমস্যা রয়েছে। এরপরও আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে এটি চালু করতে চেষ্টা চালাচ্ছি। ’

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক এ এইচ এম মোবারক উল্লাহ বলেন, ‘গত ২১ সেপ্টেম্বর শিকলবাহা কেন্দ্র অপ্রত্যাশিত বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কবলে পড়লে আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে বিকল্প ব্যবস্থায় শাহমীরপুর থেকে স্বল্প পরিসরে হলেও তিন উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ দিচ্ছি। ওই তিন উপজেলায় ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে সন্ধ্যায় মাত্র ২০ মেগাওয়াট দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছি। ফলে অনেক গ্রাহক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ’

পল্লী বিদ্যুৎ বোয়ালখালীর উপ-মহাব্যবস্থাপক

মো. সাকাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বোয়ালখালীতে ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে মাত্র চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলছে। ’

ব্যবসায়ী আবু তাহের বলেন, ‘বোয়ালখালীতে গত ১০ দিন ধরে বিদ্যুৎ একবার গেলে কখন ফিরবে এর খবর নেই। তাহলে ঘটা করে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা ঘোষণার কোনো অর্থ আছে! ইতোমধ্যে এলাকাবাসী সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অন্যথায় অফিস ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি নিতে বাধ্য হব। ’

এলাকাবাসী জানান, ২৪ ঘণ্টায় হিসাব করলে মোট পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না।

উত্তর গোমদণ্ডীর বাসিন্দা আবদুল মজিদ বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার বারোটা বাজছেই। রান্না-খাওয়াসহ কোনো কাজও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। তীব্র গরমে মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে সকালেও এর দেখা মেলে না। ফলে আজ অনেক দিন ধরে রাতে ঘুমাতে পারছি না। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গত বছর আগুন লেগে ট্রান্সফর্মারসহ অনেক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সাথে চুক্তির মাধ্যমে এনার্জি প্যাক কম্পানি ট্রান্সফর্মারটি পুনরায় স্থাপন করে। চুক্তির শর্তানুসারে এক বছরের মধ্যে এর কোনো ক্ষতি হলে তা ওই কম্পানি নিজ খরচে পুনঃস্থাপন করবে। ফলে নয় মাসের মাথায় ওই ট্রান্সফর্মার নষ্ট হওয়ায় এনার্জি প্যাক কর্তৃপক্ষ এটি পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে ট্রান্সফর্মারটির ওজন ৬০ টন হওয়ায় প্রথমে তা ঢাকা থেকে নৌপথে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় গত রবিবার ট্রান্সফর্মারটি দুই ভাগ করে সড়কপথে গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজার নিয়ে আসা হয়। এটি কর্ণফুলীর পূর্বপাড়ে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে নদীপথে নিয়ে গিয়ে ২/৩ দিনের মধ্যে সংযোজনের কার্যক্রম চালাবে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।


মন্তব্য