kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিসর্গের বান্দরবানে নির্বিকার পর্যটন করপোরেশন

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় সৈকতনগরী কক্সবাজারের পরেই স্থান করে নিয়েছে বান্দরবান। তবে কক্সবাজারে বর্ষা মৌসুমে পর্যটক টানতে হোটেল-মোটেলে ‘বিশাল ছাড়’ দিতে হলেও বান্দরবানে বছরজুড়ে থাকে পর্যটকের চাপ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় তহজিন ডং-ক্যওক্রাডং-গোল পাহাড়-নীলগিরি-চিম্বুক, নীলাচল পাহাড়চূড়া, দেশের সবচেয়ে উঁচু অবকাশকেন্দ্র নীলগিরি রিসোর্ট, সবচেয়ে উচ্চতার সড়কপথ থানচি-আলীকদম সড়ক বান্দরবানে। দেশের নিজস্ব নদী শঙ্খ ও মাতামুহুরী, অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্না, পাহাড় চূড়ার বগালেক, নাফা খুম এবং শঙ্খ নদীপথে যেতে চোখে পড়বে রি সং সং ঝর্না, রেমাক্রি ঝর্না ও তিন্দুর পাথুরে জলপথ। আরো আছে ১১টি আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পাশাপাশি বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ও রাখাইন জনজাতির বসবাস। তাঁদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির আস্বাদ পেতে বান্দরবানে ছুটে আসেন দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটক।

বর্ষার রিমঝিম শব্দে পাহাড় চূড়ার কোনো রিসোর্টে সময় কাটানো, কিংবা রেস্টুরেন্টে চায়ের পেয়ালায় চুমুক, গা ছুঁয়ে মেঘের ভেসে যাওয়া অথবা শেষ বিকেলে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত পর্যবেক্ষণ কী যে অপার অনুভূতি! তা যাঁরা দেখেননি, তাঁদের কাছে অনুভবেরও অতীত। জুন-অক্টোবর প্রান্তিকে জুমঘরে রাত কাটানো কিংবা জুমের ধানের ভাতে মধ্যাহ্ন কিংবা রাতের ভোজন কী যে মধুর! তা বুঝতে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে হেঁটে অনেকে চলে যান দূরের আদিবাসীপাড়ায়।

পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে ইতোমধ্যে বান্দরবান শহরের আশেপাশে বেশ কটি বিলাসী হোটেল, অরণ্যস্পর্শী কয়েকটি রিসোর্ট এবং সহনীয় ব্যয়ের কিছু ভালো হোটেল কিংবা কম খরচের হোটেলও গড়ে ওঠেছে। এ ছাড়া উপজেলা শহর কিংবা দূরের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আশপাশে রয়েছে আদিবাসীদের ঘরোয়া কটেজ ও খাবার-দাবারের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা প্রাইভেট সেক্টরে। স্থানীয় প্রশাসনও এদিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে। জেলা শহরের নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত, নাইক্ষ্যংছড়ির উপবন লেক কমপ্লেক্স, লামার মিরিঞ্জা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘নীলগিরি রিসোর্ট’ তো এখন বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের ‘আইকন’।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক পর্যটনও এখানে সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। স্বর্ণমন্দির, রামজাদি মন্দির, শহরের চারদিকে মালার মতো অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির দেখতে আসছেন লাখো মানুষ। বান্দরবানের পরিচিতি এখন যেন স্বর্ণমন্দিরের স্বর্ণাভ প্যাগোডার ছবি। রামজাদি মন্দিরের আকাশ ছোঁয়া শুভ্র রঙের স্থাপনা বারবার দেখেও যেন তৃপ্ত হওয়া যায় না।

শঙ্খ এবং মাতামুহুরী নদীতে নৌভ্রমণ, খোলা জিপে (চাঁদের গাড়ি) চেপে পাহাড় চুড়ো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বনের ভেতর দিয়ে ছুটে চলা কিংবা থানচি-আলীকদম সড়ক দিয়ে ‘লং ড্রাইভ’ হতে পারে অতুলনীয় অভিজ্ঞতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরো গতিশীল করতে সরকারও সচেষ্ট। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি-বান্দরবান হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ একটি পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ছোট-বড় অনেক উদ্যোগ পাহাড়-পাড়ায় সংযোগ স্থাপন করে আরো বেগবান করে যাচ্ছে বিদ্যমান পর্যটন সম্ভাবনাকে। বান্দরবানের সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন-এই জেলাকে পর্যটনবান্ধব জেলায় রূপ দিতে। এত কিছু সত্ত্বেও শুধু আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠকরা অভিযোগ করেছেন, এতবড় সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চলে ২৫ কক্ষের একটি মাত্র হোটেল ছাড়া আর কোনো কিছুই নেই ওই মন্ত্রণালযের। মেঘলায় স্থাপিত পর্যটন হোটেলটিও পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। গত কয়েক বছর আগে এই হোটেল স্থাপিত হলেও জেলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পর্যটন করপোরেশনের কোনো অফিস বা তথ্যকেন্দ্রও নেই জেলার কোথাও। গত বছরে অন্যদের সাথে মিলে পর্যটন কার্নিভাল কিংবা মাঝে মাঝে কিছু উদ্যোগ নিলেও বছরের ৩৬৫ দিনে পর্যটন করপোরেশন থাকে নির্বিকার। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলেছেন, সরকারি-প্রাইভেট-ব্যক্তিগত উদ্যোগের সাথে ওই বিষয়ে অভিজ্ঞ পর্যটন করপোরেশন এগিয়ে এলে বান্দরবান হয়ে ওঠতে পারে পর্যটন খাতে দেশের প্রধানতম অর্থনৈতিক অঞ্চল।

 


মন্তব্য