kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উপকূলীয় এলাকার শিশুরা পড়াশোনায় পিছিয়ে

‘পরিবারে অভাব অনটনই কারণ’

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাঁচ বছরের পলাশ। ঠিকমতো বুঝতে শিখেনি, শুরু হয়নি স্কুলে যাওয়াও।

কিন্তু এখনই বাবার হাত ধরে প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরতে যেতে হয় তাকে। শিক্ষা নয়, জন্মের পরপরই এসব কাজে হাতেখড়ি হয় একই পাড়ার সুমন, রাজেশ, সুজিত, রামুসহ প্রায় সব শিশুর। আর এর মধ্য দিয়ে স্কুলে যাওয়ার আগেই মাছধরায় দক্ষ হয়ে উঠছে তারা! হয়ে ওঠে বাবার অন্যতম সহকারী।

কারো কারো আবার স্কুলে যাওয়াই হয়ে ওঠে না। বাড়তি উপার্জন, আর কাজে দক্ষ করে তুলতেই স্কুলগামী শিশুদের কাজে পাঠান অভিভাবকরা। সন্তান পড়ালেখা শিখুক-এটা তারা যেমন চান, আবার সংসার চালানোর বিদ্যা শিখুক, সেটাও চাওয়া তাঁদের। তবে সবচেয়ে বড় কথা পেটের দায়! ফেনী জেলার সোনাগাজীর উপকূলীয় চরচান্দিয়া এলাকার চিত্র এটি।

সরেজমিন দেখা যায়, নরম হাত থেকে বই নামিয়েই শিশুরা চলে আসে জাল টানতে, মাছ ধরতে, কেউবা গরু চরাতে। পরিবারের সদস্যরা তাদের ওপর ভরসাও করেন।

স্থানীয়রা বলছেন, পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে ওই অঞ্চলের অধিকাংশ শিশু লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ছে। চরাঞ্চলের অসংখ্য শিশু স্কুলে না গিয়ে ঝুঁকে পড়ছে রোজগারের দিকে।

নয়ন জলদাস বলেন, ‘পেট চলে না। স্কুলে পাঠাই ঠিকই। কিন্তু বেশিদিন তো আর পড়াতে পারব না। তাই ছেলেবেলা থেকেই বাপদাদার পেশায় তাদের দক্ষ করে তুলি। ’

দক্ষিণ-পূর্ব চর চান্দিয়ায় দেখা হয় সাত বছর বয়সী মাদ্রাসা ছাত্র আরাফাতের সঙ্গে। তার বাড়িতে ১০টি গরু আছে বলে জানায় আরাফাত। সেগুলো নিয়মিত মাঠে নিয়ে আসা-যাওয়ার কাজ তাকেই করতে হয়। মাদ্রাসায় যাওয়ার আগে গরুগুলোকে মাঠে দিয়ে মাদ্রাসা শেষে ফেরে। বিকেলের দিকে রোদের তীব্রতা কমে এলে ফের গরু নিয়ে মাঠে যেতে হয়। এটি তার নিত্যদিনের দায়িত্ব।

নয় বছর বয়সী রাজেশের গল্প আরেকটু আলাদা। ২০১০ সালে নদী ভাঙনে বাড়ি-ঘর হারিয়ে যাওয়ায় পরে সরকারি একটি বস্তিতে আশ্রয় নেয় তার পরিবার। সংসারের হাল ধরতে পিছিয়ে নেই সেও। ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার এলে বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে যায়, আবার ভাটায় ফিরে আসে। এভাবেই কাটছে তার শৈশব। এখন তাকে দক্ষ জেলে বলা চলে। তবে পড়াশোনা করতে না পারার দুঃখ তার রয়েই গেছে। বিষন্ন মুখে বলে, ‘পড়ার ইচ্ছা আছিল। কিন্তু নদী ভাঙনে বাপের সব গেছে। তাই আর পড়া হয় নাই। ’

কথা হয় স্থানীয় শিক্ষক শেখ আবদুল হান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পড়ালেখার চেয়ে নদীতে মাছধরা বা অন্যান্য কাজে সন্তানদের দক্ষ করতেই বেশি পছন্দ চরাঞ্চলের অভিভাবকদের। জলদস্যু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারিয়ে ফেললে বাধ্য হয়েই তারা সন্তানদের নানা পেশায় যুক্ত করেন। ’


মন্তব্য