kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মাসখানেক আগেও কেজি পাঁচ টাকায় বিক্রি করা যায়নি, এখন ১৫

হঠাৎ লবণের দাম বৃদ্ধি চাষির মুখে হাসি

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হঠাৎ লবণের দাম বৃদ্ধি চাষির মুখে হাসি

লবণ মাঠের ছবিটি চকরিয়ার বদরখালী থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

হঠাৎ করে লবণের দাম বেড়ে গেছে। এতে লবণ চাষিদের মাঝে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য।

মাসখানেক আগেও উৎপাদিত লবণ মাঠে প্রতিকেজি পাঁচ টাকায়ও বিক্রি করা যায়নি। ফলে চাষিরা ছিলেন চরম হতাশ। সেই লবণ এখন বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৫ টাকায়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) কক্সবাজার অফিসের তথ্যমতে, বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল লবণ উৎপাদনের মৌসুম। গেল মৌসুমে কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়াসহ সাত উপজেলার উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৬০ হাজার একর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৭ হাজার ২৫৬ একর জমিতে লবণ উৎপাদনে নামেন চাষিরা। সরকারিভাবে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু প্রকৃতির বৈরি আচরণে লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। উৎপাদন হয় ১৫ দশমিক ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় বিদেশ থেকে দেড় লাথ মেট্রিক টন লবণ আমদানির অনুমতি দেয় মিল মালিকদের।

চকরিয়া খুটাখালীর লবণচাষি ফরিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে প্রতিমণ কালো লবণ বিক্রি হয়ে আসছিল ৮৫ টাকা, মাঠওয়াশ ৯৬ টাকা এবং পলিথিন পদ্ধতিতে ১১৮ টাকা। এছাড়া শ্রমিক নিয়োগ এবং পলিথিনের মূল্য মিলে প্রতিমণ লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ে ১৩০ টাকা। কিন্তু এই বিক্রিমূল্য ন্যায্য নয়। এতে মাঠপর্যায়ের চাষিরা হতাশায় ভুগছিলেন। ’

তিনি জানান, উৎপাদনের এখন মৌসুম না হলেও মাঠে মজুত রাখা লবণ বিক্রি করতে ধুম পড়েছে। একমাস আগেও প্রতিকেজি লবণ ৫-৬ টাকায়ও বিক্রি করা যায়নি। এখন সেই লবণে ১৫ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন চাষিরা। যা খুবই খুশির খবর। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে চাহিদার অতিরিক্ত লবণ উৎপাদনের জন্য আঁটঘাট বেঁধে নামবেন চাষিরা।

জানা গেছে, চলতি বছরের লবণ উৎপাদন মৌসুমে এপ্রিল মাসে চকরিয়া ও পেকুয়ায় কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় উৎপাদন। এতে হাজারো চাষি ক্ষতির শিকার হন। পুরোদমে লবণ উৎপাদনের শেষ দিকে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে মাথায় হাত উঠেছিল চাষিদের।

তবে শেষমুহূর্তে স্বাভাবিক আবহাওয়ার পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত রোদে লবণ উৎপাদনের জন্য ধুম পড়ে যায় মাঠে মাঠে। প্রখর রোদেও চাষি ও শ্রমিকেরা লবণ মাঠে ব্যস্ত সময় কাটান।

বাংলাদেশ লবণ চাষি সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চকরিয়ার অন্যতম লবণ ব্যবসায়ী হারুণুর রশিদ বলেন, ‘গেল লবণ উৎপাদন মৌসুমের শেষদিকে প্রাকৃতিক বৈরি আচরণ দেখা দিলেও সরকারের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি লবণ উৎপাদন হয়। তবে বড় বড় লবণ চাষিরা তাঁদের উৎপাদিত লবণ তখন মিল মালিকদের কাছে বিক্রি না করে মাঠে এবং গোডাউনে মজুত করে রেখেছিলেন দাম একেবারে কম হওয়ায়। ’

তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে লবণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিরা মজুতকৃত সেই লবণ এখন বেশি দাম পেয়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন মিল মালিকদের কাছে। এতে চাষিরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আগামী মৌসুমে ব্যাপকভাবে লবণ উৎপাদনের জন্য মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

পেকুয়ার মগনামা ইউনিয়নের লবণচাষি শহীদুল ইসলাম, চকরিয়ার পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়নের ছমি উদ্দিন, বদরখালীর আকতার আহমদ বলেন, এখন প্রতিমণ লবণ বিক্রি করছি আমরা সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায়। যা আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সরকার লবণ উৎপাদন মৌসুমে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ রাখতে উদ্যোগ নেওয়ায় এর সুফল পাচ্ছেন চাষিরা। যা চাষিদের জন্য অনেকটা আনন্দের খবর।

চাষিরা জানান, মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে উপকূলের লবণ চাষিরা এখন বেশ উত্ফুল্ল। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

তাঁরা বলেন, দেশে ইতোপূর্বে লবণের বাম্পার উৎপাদন হলেও মৌসুম চলাকালীন সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে মিল মালিক সিন্ডিকেটদের আঁতাতে প্রতিবছর বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করায় এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করেন চাষিরা। লবণকে লোকসান পণ্য হিসেবে ধরে নিয়ে অনেকে লবণচাষ থেকে বিরতও রয়েছেন। তবে আশার কথা, সরকারের লবণ নীতি অনুযায়ী দাম যেহেতু বাড়তির পথে সেহেতু এই শিল্প আবারও আলোর মুখ দেখবে।

আমদানির বিষয়ে জানতে চাইলে এসব চাষি বলেন, এখন যেহেতু লবণ উৎপাদন মৌসুম নয়, সেহেতু চাহিদা অনুযাযী শিল্পখাতে ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানি করলেও এতে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার বিসিকের জুনিয়র কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘সামনের কোরবানির ঈদের চামড়াজাত পণ্যে ব্যবহারের জন্য লবণের বিপুল চাহিদা রয়েছে। তাই দেশে উৎপাদিত লবণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিরাও খুশি। বর্ষার সময় লবণ উৎপাদন না হলেও আগে মজুদকৃত লবণ দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন মাঠপর্যায়ের চাষিরা। ’


মন্তব্য