kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কলঙ্কমুক্তির প্রহর গুনছে চট্টগ্রাম

নূপুর দেব   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কলঙ্কমুক্তির প্রহর গুনছে চট্টগ্রাম

‘চট্টগ্রামের জল্লাদ’ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পর মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে কলঙ্কমুক্তির প্রহর গুনছে চট্টগ্রাম। মীর কাসেমের গ্রামের বাড়ি ঢাকার মানিকগঞ্জে হলেও একাত্তরে চট্টগ্রামেই ছিল তাঁর মানবতাবিরোধী সব অপরাধ।

নগরের ডালিম হোটেলকে ‘ডেথ ফ্যাক্টরিতে’ পরিণত করেন একাত্তরের আলবদর বাহিনীর এই অঞ্চলের প্রধান।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও শহীদ পরিবারসহ সর্বস্তরের মানুষ। গত মঙ্গলবার মীর কাসেমের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে তাঁর ফাঁসির রায় বহাল থাকায় কলঙ্কমুক্তির প্রহর গুনছেন চট্টগ্রামবাসী। কবে এই নরঘাতকের ফাঁসি কার্যকর হবে, সেদিকে তাকিয়ে আছেন সবাই।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২২ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য চট্টগ্রামের রাউজানের সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হতে যাচ্ছে। তাঁর ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামবাসীর ৪৬ বছরের কলঙ্কমুক্তি হতে যাচ্ছে।

আপিল বিভাগে মীর কাসেমের ফাঁসির রায় বহাল থাকার পর থেকে চট্টগ্রামে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ শোভাযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রায় ঘোষণার পর গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন তাত্ক্ষণিক নানা কর্মসূচি পালন করে। গতকাল বুধবারও নগর ছাত্রলীগ ও যুবমঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন মিছিল-সমাবেশ করেছে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধকালীন অপহরণ, রোমহর্ষক নির্যাতন, হত্যা ও গণহত্যার সাক্ষী সেই ‘ডালিম হোটেল’ ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য জাদুঘর করার দাবি ওঠেছে। নগরের নন্দনকানন পুরনো টিএন্ডটি অফিস কাটাপাহাড় সড়কে ওই ভবন দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমান উত্সুক মানুষ।

চট্টগ্রামে একাত্তরে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমদকে হত্যার দায়েই মীর কাসেম আলীর ফাঁসি বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জসিমের মামাতো বোন ও মামলার এক নম্বর সাক্ষী হাসিনা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তিন বোন। কোনো ভাই ছিল না। ফুফাতো ভাই ১৮ বছর বয়সী জসিমই ছিল আমাদের ভাই। মুক্তিযুদ্ধকালীন জসিমকে অপহরণের পর নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন মীর কাসেম আলী। ’

চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাকা চৌধুরীর পর চট্টগ্রামের আরেক কুলাঙ্গার মীর কাসেম আলীর ফাঁসি হতে যাচ্ছে। তাঁর ফাঁসি যত দ্রুত কার্যকর হবে ততই দেশের মঙ্গল। ’

চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের সদস্য সচিব চন্দন দাশ বলেন, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সফরে খানিকটা শঙ্কা তৈরি হলেও রায় বহাল থাকায় তা কেটে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় যখন দ্বারপ্রান্তে তখনও আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে। তাই রায়ের আগের দিন জন কেরির সফরে উদ্বিগ্ন ছিলাম। এখন স্বস্তি পাচ্ছি। ’

ডালিম হোটেলে নির্যাতিত রাজনীতিবিদ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাইফুদ্দিন খানের স্ত্রী নূরজাহান খান রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করে ওই হোটেল সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মীর কাসেমের তত্ত্বাবধানে ডালিম হোটেলে আমার স্বামীসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। স্থাপনাটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। ’

চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চের সমন্বয়ক শরীফ চৌহান বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিতে হবে। ডালিম হোটেল অধিগ্রহণ ও কাসেমের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ’

মীর কাসেম আলীর ফাঁসি বহাল রাখার রায়ে প্রতিক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া মৃদুল দে বলেন, ‘মীর কাসেম যে অপরাধ করেছে তাতে তার একবার নয়, ১৪ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। ’

ডালিম হোটেলের বিভীষিকাময় সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, ‘মীর কাসেম বিচার বন্ধ করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী বলেই মীর কাসেমের মতো যুদ্ধাপরাধী টাকা খরচ করেও পার পায়নি। এ রায় কার্যকর হলে জাতি বিশেষ করে চট্টগ্রামবাসী কলঙ্কমুক্ত হবে। ’

চট্টগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সাহাব উদ্দিন আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রামের সদর দপ্তর ডালিম হোটেলকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘর বানানোর দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আলবদর প্রধান হিসেবে মানুষের ওপর যে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছিল মীর কাসেম, আদালত তার ফাঁসির রায় বহাল রাখায় আমরা খুশি। ডালিম হোটেলকে মৃত্যুর কারখানায় পরিণত করেছিল মীর কাসেম আলী। তার ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করা হোক। ’


মন্তব্য