kalerkantho


কুতুবদিয়ায় ছয় ইউনিয়নের চারটিতেই নৌকার ভরাডুবি

প্রার্থী নির্বাচনে ‘ভুল’, মনোনয়ন পান শিবির ক্যাডারের ভাইও

তোফায়েল আহমদ,কক্সবাজার   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রার্থী নির্বাচনে ‘ভুল’, মনোনয়ন পান শিবির ক্যাডারের ভাইও

কুতুবদিয়ায় জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে মাইক হাতে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে পরাজিত আ. লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আজমগীর মাতব্বর (গোল চিহ্নিত)। ফাইল ছবি

দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় ছয় ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতেই চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের ভরাডুবি হয়েছে। দুই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও অন্য দুটিতে স্থান হয় তিন নম্বরে।

প্রার্থী নির্বাচনে ‘ভুলের’ কারণে ওই অবস্থা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন দলের নেতারা।

শুধু ‘জনবিচ্ছিন্ন’ প্রার্থী নয়, চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর ‘এইট মার্ডার’ মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডারের এক ভাইয়ের হাতেও তুলে দেওয়া হয় নৌকা প্রতীক। এসব বিষয় খুব একটা ভালোভাবে নেননি দলের সাধারণ নেতাকর্মী ও ভোটাররা। গত ২২ মার্চ এখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুতুবদিয়ার দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী আরিফ মোশাররফ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ ছিল না। নির্বাচনে তাঁর অবস্থান হয়েছে তৃতীয়। এখানে তৃতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি নেতা সৈয়দ আহমদ।

উত্তর ধুরুং ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইয়াহিয়া কুতুবী কুতুবদিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

এলাকায় তাঁর যাতায়াত ছিল সীমিত। এখানে তিনবারের চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা শাহরিয়ার চৌধুরী আবার জিতেছেন। আর নৌকার প্রার্থী হয়েছেন দ্বিতীয়।

লেমশীখালী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রবীণ রাজনীতিক ছৈয়দ আহমদ কুতুবীর শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। তিনি কুতুবদিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘদিন ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তবু অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক এবারের নির্বাচনে দ্বিতীয় হয়েছেন। এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা আকতার হোসেন।

আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী নুরুচ্ছফা বি কম এবং বড়ঘোপে অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও বিজয় নিয়ে নানা কথা ওঠেছে। ইউনিয়ন দুটির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী সকাল ১০টার দিকেই ভোটকেন্দ্র ‘দখলের’ অভিযোগে নির্বাচন বয়কট করেন। তবে নির্বাচিতরা দাবি করেছেন, নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে সবচেয়ে ‘বিতর্ক’ সৃষ্টি হয়েছে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে। কুতুবদিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আওরঙ্গজেব মাতব্বরের ভাই বর্তমান চেয়ারম্যান আজমগীর মাতব্বরকে নৌকার প্রার্থী করা হলেও নির্বাচনে তাঁর স্থান হয় তিন নম্বরে।

এলাকার লোকজন জানান, নৌকার প্রার্থী আজমগীর মাতব্বরের ছোটভাই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম হলেন চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ১৯৯৭ সালে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ‘এইট মার্ডার’ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ শিবিরক্যাডার। বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ ভোটাররা ভালোভাবে নেননি। ফলে পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে! এছাড়া ওই প্রার্থীর বড়ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আওরঙ্গজেব মাতব্বরের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ।

জানা গেছে, ২০১২ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আওরঙ্গজেবের হাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী প্রহৃত হয়েছিলেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আওরঙ্গজেবকে কারাগারেও ছিলেন অনেকদিন।

কুতুবদিয়ায় জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে তাঁর ছবি প্রসঙ্গে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী আজমগীর মাতব্বর বলেন, ‘ছবিটি কৃত্রিমভাবে লাগানো হয়েছে। আর বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণেই নির্বাচনে হেরেছি আমি। ’

দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি প্রসঙ্গে আওরঙ্গজেব মাতব্বর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ছিল-এটা অস্বীকার করতে পারব না। তবে আমরা প্রশাসনিক সহযোগিতাও পাইনি। দলীয় নেতারা দিনের বেলায় দলীয় প্রার্থীর পক্ষে থাকলেও রাতে ছিলেন বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে। এসব কারণেই ঘটেছে ভরাডুবি। ’ তিনি দাবি করেন, তাঁর ছোটভাই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ‘এইট মার্ডার’ মামলার আসামি নন। তবে তিনি অন্য একটি হত্যা মামলায় বর্তমানে কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

কুতুবদিয়া উপজেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে, দ্বীপের দুর্ধর্ষ শিবিরক্যাডার সেলিম ‘এইট মার্ডার’ মামলায় দণ্ডিত আসামি হিসেবেই গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া চকরিয়া থানার বর্তমান ওসি জহিরুল ইসলাম খান কুতুবদিয়া থানায় কর্মরত থাকার সময় এইট মার্ডারের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়েই শিবিরক্যাডার সেলিমকে আটক করেছিলেন বলে জানা যায়।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান নুরুচ্ছফা বি কম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুতুবদিয়ার মানুষ এমনিতেই বেশি মাত্রায় আওয়ামী বিদ্বেষী। এছাড়া দলের প্রার্থীদের অনেকেরই অবস্থা  ছিল জনবিচ্ছিন্ন-এটা সত্যি। ’


মন্তব্য