kalerkantho


পর্যটকে ঠাসা কক্সবাজার বিদেশির দেখা নেই

পর্যটকে ঠাসা কক্সবাজার বিদেশির দেখা নেই   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পর্যটকে ঠাসা কক্সবাজার বিদেশির দেখা নেই

সোনাদিয়া দ্বীপের যে কাঠের ঘাটে পর্যটকবাহী নৌকা থামে, জোয়ারের সময় তাও প্রায় ডুবে থাকে। যাত্রীদের সৈকতে নামতে গিয়ে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। ছবি : রবি শংকর

২৫ ও ২৬ মার্চ ছিল দুদিনের সরকারি ছুটি। পরদিন ২৭ মার্চ ‘ইস্টার সানডে’ উপলক্ষে বন্ধ ছিল দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ছুটির সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ভ্রমণপিপাসুরা। আর স্বাভাবিকভাবেই এ ভ্রমণের মূল স্রোত ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার অভিমুখে।

আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ীদের মতে, ৪৩০টি হোটেল-মোটেলে প্রায় ৩৫ হাজার অতিথির ধারণক্ষমতার কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না ওই তিনদিন। এমনকি অনেকে হোটেল-মোটেলে জায়গা না পেয়ে সমুদ্রসৈকতেই রাত কাটিয়েছেন।

এটি যদি দেশের পর্যটন খাতের জন্য সুখবর হয় তাহলে উল্টো পিঠে হতাশার খবর হচ্ছে, এই পর্যটকদের প্রায় সবাই বাংলাদেশি। বিদেশি পর্যটক নেই বললেই চলে। ফলে যতই পর্যটকে ঠাসা থাকুক কক্সবাজার, দেশের টাকা কিন্তু দেশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের পর্যটনখাত।

গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এবং এর আশেপাশের এলাকা ঘুরে ১০ জন বিদেশি পর্যটকও চোখে পড়েনি।

ভরা মৌসুমে বিদেশি পর্যটকের এমন খরা কেন? এ ব্যাপারে হোটেল-ব্যবসা সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা জানান, বেশ কয়েকবছর ধরেই বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতে বিদেশি পর্যটকের আগমন কমে গেছে। এ জন্য প্রচারণার অভাবকেই মূলত দায়ী করেন তাঁরা। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য সুযোগ-সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে। এর সাথে নিরাপত্তার অভাব মিলিয়ে বিদেশি পর্যটকদের সেভাবে টানতে পারছে না প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি কক্সবাজার।

পর্যটনের ভরা মৌসুমেও কক্সবাজারে শূন্য দশমিক শূন্য এক (০.০১%) শতাংশ বিদেশি পর্যটক আসে না বলে জানালেন কলাতলী সৈকত সংলগ্ন বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস হোটেলের মহাব্যবস্থাপক এস এম শাহাবুদ্দিন।

বিষয়টি নিয়ে বেশ হতাশা ব্যক্ত করলেন চট্টগ্রামের চারতারা হোটেল দ্য পেনিনসুলার কম্পানি সচিব মোহাম্মদ নূরুল আজিম। এ মাসের শুরুতেই নেপাল সফরের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘নেপালে প্রতিদিন সরকারিভাবে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একটানা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যবহার্য পানি পাওয়াও মুশকিল। রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে প্রায় পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়ে। এর পরেও সেই দেশে বিদেশি পর্যটক গিজগিজ করে। কাঠমান্ডু থেকে থেকে পোখরা সব জায়গায় বিদেশিদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। অথচ ওদের দর্শনীয় স্থান বলতে সেই পাহাড় আর পর্বতই। সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক বেশি ভাগ্যবান। কারণ, এদেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। এখানে একাধারে সাগর, নদী, পাহাড়, লেক কী নেই বাংলাদেশে! কিন্তু এর পরেও আমরা বিদেশিদের সেভাবে আকর্ষণ করতে পারিনি। প্রচারও সেভাবে নেই। ’

তিনি আরো বলেন, ‘কক্সবাজারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে হয়তো কোনো বিদেশি পর্যটক আসবেন কিন্তু এর বাইরেও তাঁদের বিনোদনের জন্য কিছু ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ, একজন পর্যটক ঘুরতে আসার আগে স্বাভাবিকভাবেই জানতে চান সেখানে উপভোগের জন্য কী কী আছে। কিন্তু সে ধরনের কোনো সুযোগ সুবিধাই নেই এখানে। এক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে ট্যুরিস্ট জোন হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে বিদেশিদের জন্য আলাদা জোন করে দিতে পারেন। প্রয়োজনে সেই জোনের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট ফি এর ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া প্যারা সেইলিং, ক্যাবল কার, সাগরে গিয়ে লাঞ্চ ও ডিনার করার মতো প্রমোদতরী, সার্ফিং এর ব্যবস্থা করে পর্যটক আকর্ষণ করা যেতে পারে। ’

ঢাকার শ্যামলী থেকে আসা ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের সব আয়োজন যেন কলাতলী আর লাবণী পয়েন্ট ঘিরে। বাকী সৈকতের দিকে কারও নজর নেই। ২৪ কিলোমিটার দূরের ইনানী বিচের পথে পুরোটাই সমুদ্রসৈকত। অথচ সেই সৈকত ঘিরে কোনো আয়োজন নেই। ’

কক্সবাজারের কাছের সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকার ব্যাংকার মাঈনুল হক সুমন বলেন, ‘প্রায় এক ঘণ্টার নৌ-ভ্রমণ শেষে সোনাদিয়া দ্বীপে নেমেই মন ভালো হয়ে গেছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের চেয়েও এখানকার পানি অনেক স্বচ্ছ এবং ঢেউয়ের আকার অনেক বড়, তাই গর্জনটাও বেশি। কক্সবাজার সৈকতে যখন পর্যটকদের ঠাঁই নেই অবস্থা তখন সোনাদিয়া সৈকত একেবারেই

নিরিবিলি। কিন্তু কাঠফাটা রোদ্দুরে এক ফোঁটা পানীয় জলও পাবেন না এখানে। অনেক দূরে একটা ঝুপড়ির চা স্টল চোখে পড়ে। নেই কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া কক্সবাজারের যে ঘাট (৬ নম্বর ঘাট) থেকে বোটে উঠতে হয় সেখানেও স্থানীয় যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। আর সোনাদিয়া দ্বীপের যে কাঠের ঘাটে বোট থামে জোয়ারের সময় তাও প্রায় ডুবে থাকে। ফলে যাত্রীদের সৈকতে নামতে গিয়ে পানিতে ভিজতে হয়। ’

তিনি বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত কক্সবাজার থেকে অন্যান্য দ্বীপে ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের আলাদা ঘাট থাকা উচিত। এছাড়া সোনাদিয়া দ্বীপে ঘাট সংস্কার, সেখানে নিরাপত্তার জন্য একটি পুলিশ বিট, কিছু ভালোমানের খাবার হোটেল এবং আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা করা গেলে অনেক পর্যটক সেখানে আসবেন। তাতে কক্সবাজারের ওপর চাপও অনেকটা কমবে। ’


মন্তব্য