kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


‘সালাহউদ্দিন ইস্যু’ কাজে লাগাতে চায় বিএনপি, জামায়াত চুপচাপ

মেয়র পদ ফিরে পেতে মরিয়া আওয়ামী লীগ

চকরিয়া

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মেয়র পদ ফিরে পেতে মরিয়া আওয়ামী লীগ

চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনের বাকি মাত্র তিনদিন। নির্বাচনী প্রচারে দিনরাত সমানে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ (বামে) ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনের বাকি আর মাত্র তিনদিন। আগামী রবিবার ভোটগ্রহণ।

চলছে শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী প্রচার। যেকোনো মূল্যে মেয়র পদ ধরে রাখতে চায় বিএনপি। তাই ‘সালাহউদ্দিন ইস্যু’ কাজে লাগিয়ে বিজয়ী হতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। অপরদিকে হারানো মেয়র পদ ফিরে পেতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। সব দলাদলি ‘ভুলে গিয়ে’ মাঠে নেমেছেন সরকারি দলের স্থানীয় সিনিয়র নেতারা।

এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলমগীর চৌধুরী। আর বিএনপি থেকে লড়ছেন বর্তমান মেয়র নুরুল ইসলাম হায়দার। এদিকে নুরুল ইসলাম হায়দারকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী বলা হলেও গণসংযোগে জামায়াতের কোনো নেতাকে এ পর্যন্ত দেখা যায়নি। ওই দলের ‘রিজার্ভ ভোট’ কার ঘরে যাবে তা নিয়ে চলছে গুঞ্জন।

বিএনপি : দলীয় প্রার্থী নুরুল ইসলাম হায়দারের প্রচারে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন নেতাকর্মীরা। তাঁরা ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন, ২০ দলীয় জোটের এই প্রার্থীকে ধানের শীষে ভোট দিলে সহসা দেশে ফিরতে পারবেন সালাহউদ্দিন। বর্তমানে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতে কারাবন্দি অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সালাহউদ্দিন।

জানা গেছে, কক্সবাজারে বিএনপির অন্যতম নীতিনির্ধারক, সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত পৌর নির্বাচনে নুরুল ইসলাম হায়দারকে বিজয়ী করতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলেন। তিনি মাঠে থাকায় নির্বাচনের ফলাফলও এসেছিল অনুকূলে।

এদিকে নুরুল ইসলাম হায়দারকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী বলে বিএনপি প্রচার করলেও গণসংযোগে দেখা যাচ্ছে না অন্যতম শরীক জামায়াতের কোনো নেতাকে। তাই নির্বাচনে জামায়াতের ‘রিজার্ভ ভোট’ কে পাচ্ছেন তা নিয়ে গুঞ্জন চলছে।

পৌরসভার বাসিন্দা ও কক্সবাজার জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি আক্তার ফারুক খোকন বলেন, ‘চকরিয়া-পেকুয়ার মানুষ সালাহউদ্দিনের জন্য পাগল। প্রতিটি নির্বাচনে তাঁর কথার বাইরে গিয়ে এখানকার মানুষ বিকল্প চিন্তা করেন না। ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান সম্বলিত ভারতের শিলং থেকে পাঠানো তাঁর একটি খোলা চিঠি ভোটারদের কাছে বিলি করছি। ’

কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এনামুল হক বলেন, ‘ভোটারেরা ভোট দিতে পারলে আর যদি অদৃশ্য কোনো হস্তক্ষেপ না হয় তাহলে এবারও নিশ্চিত বিজয় হবে হায়দারের। ’

তবে বিএনপিতে কোণঠাসা কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গতবারের নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমেদ মাঠে থাকায় সহজ ছিল বিএনপি প্রার্থীর বিজয়। কিন্তু যে আশায় হায়দারকে মেয়র নির্বাচিত করেছিলেন, সেই আশা পূরণ হয়নি পৌরবাসীর। পাঁচ বছরেও পৌরশহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করতে না পারায় বন্যায় পৌরসভার মানুষ চরম মাশুল দিচ্ছে।

বিএনপির প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র নুরুল ইসলাম হায়দার বলেন, ‘আমি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর টানা একমাসও নিয়মিত অফিস করতে পারিনি। একের পর এক রাজনৈতিক মামলায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ঘানি টানতে আমাকে আদালতের বারান্দায় সময় কাটাতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত পাঁচ বছরে শত কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছি। আর বরাদ্দ না পাওয়ায় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পৌরবাসী আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা ও পৌরসভা জামায়াতের একাধিক নেতা বলেন, বিএনপি এবং জামায়াতের ওপর যে দমন-নিপীড়ন চলছে তা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না স্থানীয় বিএনপি। জোটের স্বার্থ বাদ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে বিএনপি নেতাকর্মীরা লিপ্ত থাকায় গত উপজেলা পরিষদের দুটি নির্বাচনে পরাজয় হয়েছে। এবারের পৌর নির্বাচনে হায়দারকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের কাছে বিএনপি প্রচার করলেও তা ভুয়া। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেও এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।

হায়দারের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী খোকন মিয়া বলেন, ‘ভোটের বাজারে অনেকে অনেক কথা বলেন ভোটারদের মন জয়ের জন্য। পৌরবাসী ধানের শীষ প্রতীকে রায় দেওয়ার জন্য প্রহর গুনছেন। ’

খোকন মিয়া আরো বলেন, ‘হায়দার ২০ দলীয় জোটেরই প্রার্থী। কৌশলগত কারণে গণসংযোগে জামায়াত নেতাদের দেখা না গেলেও তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। জামায়াতের ভোটও ধানের শীষ পাবে। ’

আওয়ামী লীগ : হারানো মেয়র পদ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই একযোগে নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দলের সিনিয়র সব নেতা। উদ্দেশ্য একটাই-দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে যেকোনো মূল্যে বিজয়ী করে আনা।

চকরিয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কাউছার উদ্দিন কছির বলেন, ‘গতবারের নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর চকরিয়া পৌরসভা কার্যালয় বিএনপির অফিসে পরিণত করেছিলেন নুরুল ইসলাম হায়দার। সেখান থেকেই আন্দোলনের নামে নানা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করেছে দলটি। তাই পৌরসভা কার্যালয় রাহুমুক্ত করতে যুবলীগের নেতাকর্মী ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন নৌকা প্রতীকে ভোট চেয়ে। ’

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এ এম আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন মিঠু এবং পৌরসভা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আবু ইউছুপ জয় বলেন, এবারের নির্বাচনে মেয়র পদ অবশ্যই আওয়ামী লীগের দখলে আনতে হবে। এ জন্য দিন-রাত সমানে নির্বাচনী গণসংযোগে মাঠে রয়েছেন ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী। ’

চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটু ও সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পৌর এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামেও পৌরশহর চিরিঙ্গা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু গতবারের নির্বাচনে পৌরসভার ভোটাররা ভুল করে নুরুল ইসলাম হায়দারকে মেয়র নির্বাচিত করেছিলেন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায়। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিলেন। পৌরবাসীর কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। তাই একের পর এক নাটক করে ভোটারদের অনুকম্পা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনের একটি খোলা চিঠি ভোটারদের কাছে বিলি করছে বিএনপি। এসব খোলা চিঠিতে আর কাজ হবে না, সালাহউদ্দিনের সেই সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে অনেক আগেই। আন্দোলনের নামে পেট্রলবোমা ছুড়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনার হুকুমদাতাদের মধ্যে অগ্রভাগে ছিলেন সালাহউদ্দিন। ’

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আলমগীর চৌধুরী বলেন, ‘গণসংযোগ করতে যেখানে গিয়েছি, সেখানে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। গত পাঁচ বছর কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে তসরুফ করেছেন কোটি কোটি টাকা। পৌরবাসী ভোটের দিন বিএনপিকে লালকার্ড দেখাবে। ’

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রার্থী আলমগীর চৌধুরীকে জিতিয়ে আনা আমার প্রধান চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরছি। ভোটারেরাও আমাকে কাছে পেয়ে আশ্বাস দিচ্ছেন নৌকার প্রার্থীকে ভোট দিয়ে মেয়র পদে বসাবেন। আমার মতো সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিমসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। ’


মন্তব্য